ডিজেল-পেট্রোলসহ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মানুষের দৈনন্দিন খরচে। বেড়েছে বাস ও লঞ্চের ভাড়া, রাইড শেয়ারিংয়ের খরচও। একই সঙ্গে বাড়ছে চাল, ডাল, ডিম ও সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম। ফলে বাড়তি খরচের চাপে অনেকটাই দিশেহারা সীমিত আয়ের মানুষ।
আগস্টে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো মূল্যস্ফীতি কমেছে। তবে কমার পরও তা ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে রয়েছে, যা এখনো অনেকটাই বেশি।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করেন আফরোজা আক্তার (২৭)। নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হয়।
বাসা, কর্মস্থল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতে রাইড শেয়ারিং বাইক ব্যবহার করেন তিনি। আগে এ বাবদ দৈনিক প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হতো তার। তবে তেলের দাম বাড়ার পর এই খরচ বেড়ে প্রায় সাড়ে চারশ টাকা হয়েছে।
আফরোজা বলেন, গতকাল বুধবার পুরান ঢাকার জয়কালী মন্দির থেকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ পর্যন্ত পাঠাও বাইকে যেতে ১৭০ টাকা লেগেছে। মাত্র দুই দিন আগেও এই ভাড়া ছিল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা।
বেড়েছে সবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের খরচও। গতকাল এক কেজি ঢ্যাঁড়স ৮০ টাকা এবং পটোল ১০০ টাকা দরে কিনেছেন বলে জানান আফরোজা।
তিনি বলেন, অনেক বিক্রেতা তো এখন ২০ টাকার কাঁচামরিচ বিক্রি করতে চান না। গত দুই মাসে নিজের জন্য মাছ-মাংস কিনিনি। শিক্ষার্থী হিসেবে আমার বাজেট কম। আমার পক্ষে এগুলো কেনা সম্ভব না।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ২৩ সেপ্টেম্বরের তথ্যেও কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার চিত্র দেখা গেছে।
এক সপ্তাহ আগে কাঁচামরিচের দাম ছিল কেজিতে সর্বনিম্ন ৮০ টাকা। কদিনের ব্যবধানে এর দাম বেড়ে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। বেগুনের দামও ৮০-৯০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। এক হালি ডিমের দাম ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ৫৫ টাকা হয়েছে।
অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। খোলা ময়দার দাম কেজিতে ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে। প্যাকেটজাত ময়দার দাম ৬০ থেকে বেড়ে ৭০ টাকা হয়েছে। মসুর ডালের দামও ৯০ টাকা থেকে বেড়ে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা হয়েছে।
আফরোজার মতো অনেক শিক্ষার্থী ও স্বল্প আয়ের মানুষ জীবনযাত্রার বাড়তি খরচের সঙ্গে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
২০ সেপ্টেম্বর সরকার প্রধান চার ধরনের জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায়। ইরান যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির বড় ধাক্কাটি শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই এসে পড়েছে।
ডিজেলের দাম লিটারে ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। অকটেন ১৪৫ থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা হয়েছে।
২০২২ সালের আগস্টের পর এটাই এক লাফে জ্বালানির দামের এত বড় বৃদ্ধি। ওই সময় ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তৈরি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছিল।
জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর মঙ্গলবার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হয়। দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। পরিবহন মালিকেরা কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়ানোর দাবি করেছিলেন।
নৌপথের ভাড়াও ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। প্রথম ১০০ কিলোমিটারে লঞ্চের ভাড়া কিলোমিটারে ২৩ পয়সা এবং এর পরের দূরত্বে ২০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন।
তবে ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। রেল মন্ত্রণালয়ের ভাড়া বাড়ানোর চাপ থাকলেও আপাতত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে লোকসানে চলছে। ১০ বছর ধরে আমরা ভাড়া বাড়াইনি। আগেও জ্বালানির দাম বাড়লেও ভাড়া বাড়ানো হয়নি।
তিনি বলেন, ভাড়া না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় কি না, আমরা দেখতে চাই। এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কয়েক দিন অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখি।
এদিকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি দূরপাল্লার ও নগর রুটের বাসের বিরুদ্ধে। অতিরিক্ত ভাড়া নিলে জরিমানা ও রুট পারমিট বাতিলের সতর্কতা থাকলেও যাত্রীদের অভিযোগ, কিছু পরিবহন বেশি ভাড়া নিচ্ছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা ৫০ টাকা বা তার বেশি ভাড়া বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন। কোনো কোনো রুটে এসি বাসের ভাড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ঢাকা থেকে খুলনাগামী গোল্ডেন লাইন পরিবহনের যাত্রী আবুল কালাম বলেন, এসি বাসের টিকিটের জন্য তাকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। আগে একই টিকিটের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা।
নগরীর যাত্রীরাও ভাড়া বাড়ার অভিযোগ করেছেন। মো. তৌহিদ বলেন, শিকড় পরিবহন তার কাছ থেকে ১০ টাকার বদলে ১৫ টাকা নিয়েছে।
তুষার মিয়া বলেন, আগারগাঁও যাওয়ার জন্য বিহঙ্গ পরিবহনের এক কন্ডাক্টর তার কাছে ৩০ টাকা ভাড়া চেয়েছেন। কারণ হিসেবে জ্বালানির দাম বাড়ার কথা বলা হয়েছে।
লঞ্চযাত্রীরাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। সদরঘাটে যাত্রীরা জানান, নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই কয়েকটি রুটে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।



