চাহিদার তুলনায় কোরবানির যোগ্য পশুর যোগান বেশি রয়েছে সিলেটে। এরপরও স্থানীয় খামারি ও প্রান্তিক গেরস্থদের দুশ্চিন্তায় ফেলছে সীমান্ত চোরাকারবারিরা। কোরবানি ঈদকে টার্গেট করে সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটের বিভিন্ন দুর্গম সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে ঢুকছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। চোরাকারবারিরা প্রতিরাতে  ট্রাক ও পিকআপ যোগে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে অবৈধ পথে আনা ভারতীয় গুরু হাটে চালান দিচ্ছে। প্রশাসন চোরাচালান বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও মাঠে তার চিত্র দেখা যাচ্ছে না।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সিলেটের সীমান্তবর্তী ছয়টি উপজেলায় নজরদারি করে বিজিবির তিনটি ব্যাটালিয়ন। ১৯ বিজিবি, ৪৮ বিজিবি ও ৫২ বিজিবি। ১৯ বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ এলাকা কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ। ৪৮ বিজিবির অধীন কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলা এবং ৫২ বিজিবির অধীন বিয়ানীবাজার। আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য শুল্ক স্টেশন ও বন্দর আছে গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও জকিগঞ্জে। এই সব কটি শুল্ক স্টেশন দিয়ে পশু আনার জন্য অনুমোদন আছে। তার পরও রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অধিক মুনাফার জন্য অবৈধভাবে পশু নিয়ে আসেন চোরাকারবারিরা।

 

সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোর প্রায় ২০টি পয়েন্ট দিয়ে ভারত থেকে গরু ও মহিষের চালান নিয়ে আসেন চোরাকারবারিরা। সবচেয়ে বেশি অবৈধ পশু আসে গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে। গোয়াইঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্তকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এসব চোরাচালানে সরাসরি জড়িত থাকেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীরা।

জৈন্তাপুরের বাসিন্দা কবির আহমদ খান জানান, গরু, ছাগল, চিনি, মসলাসহ চোরাই পথে ভারত থেকে অবাধে বাংদেশে বিভিন্ন পণ্য ঢোকে। গভীর রাত থেকে ভোররাত পর্যন্ত চলে বেপরোয়া চোরাচালান। এর কিছু কিছু ধরা পড়লেও সিংহভাগই অধরা থেকে যায়।

সিলেটের খামারিরা বলছেন, ‘আমরা খামারিরা অনেক কষ্ট করে এবার গরু লালন-পালন করছি। এবার পশু পালনে খরচ বেড়েছে। এখন যদি অবৈধ পশু এসে হাট দখল করে তাহলে আমরা লোকসানের মুখে পড়ব। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু আনা বন্ধে সরকারকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। তা না হলে দেশে দিন দিন খামারি কমে যাবে।’

সিলেট বিভাগীয় প্রাণী সম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এ বছর কোরবানির জন্য সিলেট বিভাগে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে মোট চাহিদা রয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ১৭৪টি পশুর। বিপরীতে কোরবানির জন্য প্রস্তুত আছে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬৪টি। বিভাগের চার জেলা মিলে চাহিদার চেয়ে বেশি আছে ১৩ হাজার ৬৯০টি পশু।

জেলাওয়ারি হিসেব অনুযায়ী এ বছর সিলেট জেলায় কোরবানির জন্য ৬৯ হাজার ২১৫টি গরু, ৩ হাজার ৮৪৭টি মহিষ, ২৩ হাজার ৯৭৩টি ছাগল, ৭ হাজার ৪৯৩টি ভেড়া ও ৩ হাজার ৪৩৭টি অন্যান্য পশু প্রস্তুত রয়েছে। সবধরণের পশু মিলে কোরবানির জন্য সিলেট জেলায় প্রস্তুত আছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৫টি পশু। আর জেলায় কোরবানির জন্য চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৩৮টি পশুর। অর্থাৎ সিলেট জেলায় কোরবানির জন্য উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা ৪ হাজার ২৭টি।

মৌলভীবাজার জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত ৩৯ হাজার ৪৮১টি গরু, ১ হাজার ৪৪৬টি মহিষ, ৩০ হাজার ৮২২টি ছাগল ও ২ হাজার ৮৩৫টি ভেড়া। কোরবানির জন্য প্রস্তুত মোট পশুর সংখ্যা ৭৪ হাজার ৫৮৪টি। আর চাহিদা রয়েছে ৭১ হাজার ৭৭২টি পশুর। জেলাটিতে চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা রয়েছে ২ হাজার ৮১২টি।
হবিগঞ্জ জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত আছে ৩৪ হাজার ৪৯২টি গরু, ৬৫৮টি মহিষ, ১১ হাজার ১২৩টি ছাগল ও ৪ হাজার ৫২৯টি ভেড়া। কোরবানির জন্য প্রস্তুত মোট পশুর সংখ্যা ৫০ হাজার ৮০২টি। বিপরীতে চাহিদা রয়েছে ৪৬ হাজার ৫০টি পশুর। জেলাটিতে চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা রয়েছে ৪ হাজার ৭৫২টি।

সুনামগঞ্জ জেলায় কোরবানির জন্য ৩৯ হাজার ৯১৪টি গরু, ৪১৫টি মহিষ, ৭ হাজার ৯৬৩টি ছাগল, ৪ হাজার ২২১টি ভেড়া প্রস্তুত রয়েছে। সবধরণের পশু মিলে কোরবানির জন্য সুনামগঞ্জ জেলায় প্রস্তুত আছে ৫২ হাজার ৫১৩টি পশু। আর জেলায় কোরবানির জন্য চাহিদা রয়েছে ৫০ হাজার ৪১৪টি পশুর। অর্থাৎ সুনামগঞ্জ জেলায় কোরবানির জন্য উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা ২ হাজার ৯৯টি।

 

সিলেট বিভাগীয় প্রাণীসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ড. আবু জাফর মো. ফেরদৌস জানান, সিলেট বিভাগের কোন জেলায় কোরবানির পশুর সংকট নেই। স্থানীয় পশু দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু ভারত থেকে গরু আসলে স্থানীয় খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। আর ন্যায্য মূল্য না পেলে খামারিরা গরু লালন-পালনে উৎসাহ হারাতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *