ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘনিষ্ঠ মহলে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চান। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনেই পদত্যাগের পরিকল্পনা করছেন তিনি। এমন দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল।

পত্রিকাটির প্রতিবেদক ড্যান হজেসের বরাতে বলা হয়, মন্ত্রিসভার এক সদস্য জানিয়েছেন—স্টারমার এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে পারছেন। চলমান সংকট ও দলীয় বিশৃঙ্খলা দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে তিনি মনে করছেন। এজন্য মর্যাদা রক্ষা করেই নিজের পছন্দমতো সময়ে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

তবে সেই ঘোষণা কবে আসবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। স্টারমারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রবীণ সহযোগী তাকে আপাতত নীরব থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের প্রাথমিক জরিপ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা উচিত হবে না।

এদিকে লেবার পার্টির ভেতরে ক্রমেই বাড়ছে অসন্তোষ। দলীয় এমপিদের একাংশ প্রকাশ্যেই স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। মন্ত্রিসভার ভেতরেও তৈরি হয়েছে বিভক্তি। একাধিক সূত্রের দাবি, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেই প্রকাশ্যে সমর্থন দিলেও আড়ালে নতুন নেতৃত্বের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম-এর ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরার সম্ভাবনাও এই রাজনৈতিক নাটকের বড় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। লেবার দলের একটি অংশ চাইছে, ১৮ জুনের মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের আগে স্টারমার যেন কোনো পদত্যাগ ঘোষণা না দেন। কারণ, নির্বাচনী প্রচারে স্টারমারবিরোধী জনমতকে কাজে লাগাতে চান বার্নহ্যামপন্থীরা।

তবে অন্য একটি অংশের আশঙ্কা, উপনির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করলে স্টারমারের ব্যক্তিগত মর্যাদা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের মতে, পরে পদত্যাগ করলে সেটি অ্যান্ডি বার্নহ্যামের চাপের ফল হিসেবে দেখা হতে পারে।

গত কয়েক সপ্তাহে ব্রিটিশ সরকারের ভেতরে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জুনিয়র মন্ত্রীদের পদত্যাগ, মন্ত্রিসভার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং প্রধান উপদেষ্টাদের মধ্যে মতবিরোধে সরকার কার্যত অস্থির অবস্থায় পৌঁছেছে।

বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  শাবানা মাহমুদের ঘনিষ্ঠ মহলের সমালোচনা স্টারমারকে ক্ষুব্ধ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি তার সাবেক ঘনিষ্ঠ কৌশলবিদ জশ সাইমন্স প্রকাশ্যে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলায় গভীরভাবে হতাশ হন প্রধানমন্ত্রী।

আরও চাপে ফেলেছে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের অবস্থান। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অনেক প্রবীণ মন্ত্রী এখন ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে গোপন যোগাযোগ শুরু করেছেন। কেউ কেউ আবার নিজেদের অবস্থান পাকা করতে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন।

পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে যখন ব্রিটিশ চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভস একটি সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের কৃতিত্ব নিজের নামে তুলে ধরেন। এতে ডাউনিং স্ট্রিটে ধারণা তৈরি হয় যে তিনি নিজেকে স্টারমারের নেতৃত্ব থেকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করছেন।

এর মধ্যেই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন ওয়েস স্ট্রিটিং। পরে খবর আসে, অ্যান্ডি বার্নহ্যামের পার্লামেন্টে ফেরার পথ তৈরি করতে নিজের আসন ছাড়ছেন জশ সাইমন্স। এতে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বার্নহ্যামকে নির্বাচনে ঠেকাতে লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যদের রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল স্টারমারপন্থীরা। কিন্তু দলটির ডেপুটি লিডার লুসি পাওয়েল শেষ মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেন।

একসময় স্টারমারের ঘনিষ্ঠরা বিশ্বাস করতেন, তিনি শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আত্মবিশ্বাসও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। দলীয় বিদ্রোহ, মন্ত্রিসভায় অবিশ্বাস এবং নেতৃত্বের সংকট এখন ব্রিটিশ রাজনীতিকে অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *