বিশ্ব রাজনীতিতে তিন পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া। তাদের মধ্যে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ রচনা হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সফরের মাত্র চারদিন পরেই বেইজিংয়ে পা রেখেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও চীন অন্য রকম এক দোস্তি চোখে পড়েছে। তার মধ্যে ট্রাম্প প্রবেশ করেছেন মূলত ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্যসহ বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে। তবে মার্কিন কিছু মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে তিনি শূন্য হাতে ফিরেছেন। এরপরই পুতিন গিয়েছেন বেইজিংয়ে। ফলে রাজনীতির এই সমীকরণ কোনদিকে ঝোঁকে তা এখনই বোঝা কঠিন। এই সফরে পুতিনের যে হাস্যোজ্বল মুখ দেখা গেছে, তা অনেক কথা বলে দেয়। এটি ২০২৬ সালে পুতিনের প্রথম বিদেশ সফর। এই সফর দেখিয়ে দেয় যে, ক্রমবর্ধমানভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া রাশিয়ার জন্য চীন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে মস্কোর অন্যতম প্রধান মিত্র বেইজিং। এখন রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। সুতরাং নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা পুতিনকে এ সম্পর্ক ধরে রাখতেই হবে। অনলাইন বিবিসি বলছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চান। তবে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠও হতে চান না। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ তাকে একটি অস্বস্তিকর অবস্থানে ফেলেছে। এই সফরে পুতিন মূলত দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চাইবেন। আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে নতুন গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প। এর মাধ্যমে প্রতি বছর ৫০০০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস চীনে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশ্বের বহু নেতা ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বেইজিং সফর করেছেন। পুতিনও সেই দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হলেন।
আলোচনার এজেন্ডায় কী?
দুই পক্ষের কর্তৃপক্ষ শি-পুতিন বৈঠকের নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি প্রকাশ করেনি। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কয়েক বছরের মধ্যে রাশিয়া-চীন বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে রাশিয়ার বিশাল জ্বালানি সরবরাহ, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস। দীর্ঘদিনের স্থগিত আলোচনার পর অবশেষে ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ পাইপলাইন নির্মাণ শুরু হতে পারে। এটি প্রতি বছর ৫০০০ কোটি ঘনমিটার রুশ গ্যাস চীনে সরবরাহ করবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটের মধ্যে এটি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করবে। ইউক্রেন যুদ্ধও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে রাশিয়া চীনের রপ্তানির ওপর নির্ভর করছে, যার মধ্যে রয়েছে ডুয়েল-ইউজ পণ্য ও ড্রোনের যন্ত্রাংশ। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ইউক্রেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে একই সঙ্গে বেইজিং রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনাও করেছে এবং সেগুলোকে অবৈধ ও অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করেছে।
মঙ্গলবার গভীর রাতে বেইজিং পৌঁছানো পুতিনের এই সংক্ষিপ্ত দুই দিনের সফরে ব্যস্ত কর্মসূচি রয়েছে। বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় স্কয়ারে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনার পর তার সূচিতে রয়েছে- চীনা নেতা শি জিনপিং ও বৃহত্তর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। বিভিন্ন নথি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা। কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার বিষয়ে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ। শৈশবে পরিচিত এক চীনা প্রকৌশলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক। রাশিয়া-চীন সম্পর্ক নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অংশগ্রহণ। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান এবং সবশেষে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে চা-আড্ডা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *