
ঈদের এই ভরা মৌসুমে ভারত সীমান্তবর্তী মৌলভীবাজার জেলার খামারিদের মনে আনন্দের পাশাপাশি ভর করেছে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। প্রতিবছর কোরবানির এই সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে চোরাই পথে অবৈধভাবে ভারতীয় গবাদি পশু দেশে প্রবেশ করে। এতে চরম বিপাকে পড়ে লোকসান গুনতে হয় দেশীয় খামারিদের। বিগত বছরের মতো এবারও যাতে তেমনটি না ঘটে, সে জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন প্রান্তিক পর্যায়ের তরুণ উদ্যোক্তা ও খামারিরা।
মৌলভীবাজার েজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলার মোট চাহিদা মিটিয়ে ২ হাজার ৮১২টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। আসছে ঈদুল আজহায় জেলায় কোরবানির পশুর মোট চাহিদা রয়েছে ৭১ হাজার ৭৭২টি। বিপরীতে স্থানীয় খামারিদের কাছে প্রস্তুত রয়েছে ৭৪ হাজার ৫৮৪টি কোরবানির পশু।
খামারিরা গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বেশ ভালোভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। জেলার ছোট-বড় প্রায় ৬ হাজার ২২৫টি খামারে এখন পশুর নিবিড় পরিচর্যা চলছে। ভালো দামের আশায় ও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে অনেক খামারে ওজন মেশিন বসিয়ে অগ্রিম পশু বিক্রির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। খামারগুলোতে ১৬০ কেজি থেকে শুরু করে প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে। পশুর আকার ভেদে খামারিরা লাইভ ওয়েটে (জীবন্ত পশুর ওজন) প্রতি কেজি ৪৮০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
খামারের পরিচর্যাকারীরা জানান, বাজারে এখন গো-খাদ্যের চড়া দাম। চড়া মূল্যের বাজারে ধানের কুঁড়া, খৈল, গমের ভুসি ও সবুজ ঘাস খাইয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজা করছেন তারা। সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় খামার পরিচালনায় আগের চেয়ে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে খামারিরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব কষে কোনো রকমে টিকে আছেন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ‘নাঈম এন্ড ইসমাইল ডেইরী ফার্ম’-এর স্বত্বাধিকারী সরোয়ার আহমদ টিপু ও ‘মালিকপুর এগ্রো ফার্ম’-এর সুপারভাইজার বিষ্ণু রঞ্জন দাস ভানু জানান, সারা বছর গবাদি পশু লালন-পালন শেষে তারা কোরবানির হাটে বিক্রির অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু এই সময়ে ভারত থেকে চোরাই পথে আসা গবাদি পশুর কারণে তারা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হন। সীমান্তের ওপার থেকে চোরাই পশু আসার কারণে খামারে পালিত অনেক গরু-মহিষ অবিক্রিত থেকে যায়, যা পরবর্তী বছরের কোরবানির ঈদ পর্যন্ত লোকসান দিয়ে টানতে হয়। তাছাড়া বিদেশী পশু বাজারে সয়লাব হলে ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না।
উদ্যোক্তাদের বাঁচিয়ে রাখতে অবৈধ পথে বিদেশী গবাদি পশুর প্রবেশ বন্ধে সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ দাবি করেন তারা। একই সাথে গো-খাদ্য ও ওষুধসহ খামারের নানা উপকরণ সহজলভ্য করা এবং সহজ শর্তে ঋণ সহায়তার আহ্বান জানান। খামারিদের মতে, সরকারিভাবে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে প্রান্তিক পর্যায়ে আরও বড় পরিসরে খামার গড়ে উঠবে, যা দেশের মাংসের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, বাজারে সুস্থ-সবল পশু নিশ্চিত করার জন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগ প্রচারণার পাশাপাশি মেডিকেল টিম গঠন করেছে।
সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আশরাফুল আলম খান জানান, খামারে গো-খাদ্যের খরচ কমাতে তারা স্থানীয়ভাবে উন্নত জাতের ঘাস চাষের পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সাথে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চোরাই পথে যাতে কোনো বিদেশী পশু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর বিষয়ে তারা তৎপর রয়েছেন।