অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবার ওয়ানডে সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃষ্টিবিঘ্নিত দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সফরকারী অস্ট্রেলিয়াকে ডাকওয়ার্থ লুইস স্টার্ন পদ্ধতিতে ৫ উইকেটে হারায় মেহেদি হাসান মিরাজের দল। আগে ব্যাট করে ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রান করে অস্ট্রেলিয়া। পরে টানা বৃষ্টি ও ভেজা আউটফিল্ডের কারণে ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। এরপর আর ব্যাটিংয়ে নামতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের সামনে  ৪১ ওভারে ১৯২ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়। এই লক্ষ্য ৩৬ বল বাকি থাকতে ছুঁয়ে ফেলে স্বাগতিকরা। ফলে এক ম্যাচ বাকি রেখেই সিরিজ নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের। ঐতিহাসিক এ সিরিজ জয়ের ম্যাচে নায়ক মূলত দুই পেসার তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান।

রান তাড়ায় বাংলাদেশের শুরুটা ছিল নড়বড়ে। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে জাভিয়ের বার্টলেটের হাতে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ড্রেসিং রুমে ফেরেন তানজিদ হাসান তামিম। তবে দলের ওপর চাপ আসতে দেননি এদিন একাদশে ফেরা সৌম্য সরকার ও তিন নম্বরে নামা নাজমুল হোসেন শান্ত।ইতিবাচক ব্যাটিংয়ে পাল্টা আক্রমণ করেন দুই বাঁহাতি ব্যাটার। পাওয়ার প্লের ৮ ওভারে বাংলাদেশ করে ফেলে ৪৮ রান। এরপরও একই ছন্দে এগিয়ে যান দুই ব্যাটার। তাদের দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ৯৩ বলে আসে ৮৬ রান। ভালো খেলতে খেলতে হঠাৎ উইকেট দিয়ে আসেন সৌম্য। ম্যাট রেনশর বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন ৫ চার ও ২ ছক্কায় ৪৭ বলে ৪২ রান করা ওপেনার। তার মতোই ফিফটির আগে ফিরে যান শান্তও। রাইলি মেরেডিথের বলে কাট করতে গিয়ে কট বিহাইন্ড হন বাঁহাতি ব্যাটার। আম্পায়ার শুরুতে আউট না দিলে রিভিউ নিয়ে সফল হয় অস্ট্রেলিয়া। ৫ চারে ৫৩ বলে ৪২ রান করে ফেরেন শান্ত। এরপর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি লিটন কুমার দাস ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত।ক্যামেরন গ্রিনের আচমকার লাফিয়ে ওঠা বলে হকচকিয়ে কট বিহাইন্ড হন ১৮ বলে ২১ রান করা লিটন। আর অ্যাডাম জ্যাম্পার বলে ছক্কা মারতে গিয়ে লং অফে ধরা পড়েন আগের ম্যাচে দলকে জেতানো ইনিংস খেলা মোসাদ্দেক (১৫)।

১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপেই পড়ে বাংলাদেশ। তবে দলকে নির্ভার রাখেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাওহিদ হৃদয়। দুজনের ৪৯ বলে ৫১ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে অনায়াসেই ম্যাচ জিতে যায় বাংলাদেশ। ২ চার ও ১ ছক্কায় ৫৫ বলে ৪০ রান করেন হৃদয়। আর মিরাজের ব্যাট থেকে আসে ১টি করে চার-ছক্কায় ২২ বলে ২২ রান।

এর আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে সফরকারীদের ব্যাটিং। তাসকিন আহমেদের করা প্রথম ওভারের চতুর্থ বলে বোল্ড হয়ে ড্রেসিং রুমের পথ ধরেন ম্যাট শর্ট। পরের ওভারে প্রথম বলে কুপার কনোলি ও শেষ বলে ম্যাট রেনশকে কট বিহাইন্ড করেন মুস্তাফিজুর রহমান। তখনও অস্ট্রেলিয়ার স্কোরকার্ডে হয়নি কোনো রান। অর্থাৎ ২ ওভারে শূন্য রানে তারা হারিয়ে ফেলে ৩ উইকেট। নিজেদের দীর্ঘ ওয়ানডে ইতিহাসে এই প্রথম রানের খাতা খোলার আগেই ৩ উইকেট হারাল অস্ট্রেলিয়া। একইভাবে বাংলাদেশও কখনও এর আগে শূন্য রানে প্রতিপক্ষের ৩ উইকেট নিতে পারেনি। ২০০৬ সালে কেপ টাউনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৫ রানে ৩ উইকেট পড়েছিল অস্ট্রেলিয়ার। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম চার ব্যাটারের মধ্যে তিনজনের শূন্য রানে আউট হওয়ারও প্রথম ঘটনা এটি। ওয়ানডে ইতিহাসেই শূন্য রানে ৩ উইকেট হারানোর চতুর্থ ঘটনা এটি। ১৯৮৩ বিশ্বকাপ ও ১৯৯৭ সালে পাকিস্তান এবং ২০০৩ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ শূন্য রানে হারিয়েছিল প্রথম ৩ উইকেট। এ নিয়ে টানা চার ম্যাচে উদ্বোধনী জুটিতে কোনো রান করতে পারলো না অস্ট্রেলিয়া। ওয়ানডে ইতিহাসে এর আগে মাত্র একটি দলের আছে এমন বিব্রতকর কীর্তি। ২০২২ সালে পাপুয়া নিউ গিনি টানা চার ম্যাচে শূন্য রানে হারায় প্রথম উইকেট। শুরুর ধাক্কা আরও বাড়িয়ে পাওয়ার প্লের মধ্যে ড্রেসিং রুমের পথ ধরেন উইকেটকিপিং ব্যাটার অ্যালেক্স কেয়ারি। মাত্র ২৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে সফরকারীরা। সেখান থেকে পঞ্চম উইকেটে ৪৩ রানের জুটি গড়েন জশ ইংলিস ও ক্যামেরন গ্রিন। এই জুটি বেশি বড় হওয়ার আগেই ভাঙেন তানভির ইসলাম। ৩৪ রান করে ফেরেন ইংলিস। আর ৫০ বলে ২৫ রান করেন গ্রিন। দুজনকেই ফেরান বাঁহাতি স্পিনার। মাত্র ৮১ রানে ৬ উইকেট হারানো দলের হাল ধরেন মার্নাস লাবুশেন ও জাভিয়ের বার্টলেট। বাংলাদেশকে হতাশায় ডুবিয়ে দুজন মিলে গড়ে তোলেন ১০৩ রানের জুটি। বাংলাদেশের বিপক্ষে সপ্তম উইকেট বা এর পরে শতরানের দ্বিতীয় জুটি এটি। এর আগে ২০১০ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে সপ্তম উইকেটে ৬৭ বলে ১২৩ রানের জুটি গড়েছিলেন নিউ জিল্যান্ডের নেইল ব্রুম ও জ্যাকব ওরাম। ওয়ানডে তো বটেই, লিস্ট ‘এ’ ক্যারিয়ারেই নিজের প্রথম ফিফটিতে ৪ চার ও ২ ছক্কায় ৪৮ বলে ৫২ রান করেন বার্টলেট। নতুন স্পেলে ফিরে দ্বিতীয় বলে বার্টলেটকে বোল্ড করে দেন তাসকিন। পরের বলে অ্যাডাম জ্যাম্পাকে বোল্ড করে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগান অভিজ্ঞ পেসার। তবে টানা তিন বলে আর উইকেট নেওয়া হয়নি তার। এর ৯ বল পরই নামে বৃষ্টি। যার ফলে সেখানেই সমাপ্তি ঘটে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের। সাত নম্বরে নামা লাবুশেন ৩ চারে ৮৫ বলে ৫৫ রানে অপরাজিত থাকেন। বাংলাদেশের হয়ে ৩টি করে উইকেট নেন মোস্তাফিজ ও তাসকিন। তানভিরের শিকার ২ উইকেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *