ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবিকে ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্য বিধানসভায় দেওয়া এই বক্তব্যের পর বিরোধী মহল, মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ নানা প্রশ্ন তুলেছেন।

বিশেষ করে এত বড় সংখ্যক মানুষকে কীভাবে চিহ্নিত করা হলো, কী প্রক্রিয়ায় সীমান্ত পার করা হলো এবং এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সংস্থা কিংবা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য কেন সামনে আসছে না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, গত দেড় মাসে ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও জানান, রাজ্যের ১২টি অস্থায়ী আটককেন্দ্রে আরও প্রায় এক হাজার ৮০০ জন রয়েছেন এবং তাদের বিষয়ে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে। কারণ এর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি প্রায় চার হাজার ৮০০ জনকে সীমান্ত পার করানোর কথা বলেছিলেন।

একই সঙ্গে আটককেন্দ্রে থাকা মানুষের সংখ্যাও তখন অনেক কম বলে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে দুই সময়ের বক্তব্যের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সমালোচকদের বক্তব্য, এত বড় সংখ্যক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানো হলে তার কোনো না কোনো প্রশাসনিক নথি, সীমান্ত সংক্রান্ত তথ্য বা সরকারি পরিসংখ্যান থাকার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে ধরনের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংখ্যা জানানো হয়নি।

রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সম্প্রতি কিছু পরিবারকে সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে নারী ও শিশুদের নিয়ে সীমান্তের নোম্যানস ল্যান্ড এলাকায় মানবিক সংকটের চিত্রও দেখা যায়। পরে তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আবার ফিরিয়ে এনে চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে।

বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তার দাবি, অবৈধভাবে বসবাসকারীদের কারণে সরকারি সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী যাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, অনুপ্রবেশের প্রশ্নকে সামনে রেখে বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে উপকারভোগীদের সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তাদের দাবি, সরকার এখনো এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করতে পারেনি যা থেকে প্রমাণিত হবে যে বিপুল সংখ্যক অনুপ্রবেশকারী সরকারি সুবিধা গ্রহণ করছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত, নাগরিকত্ব এবং অনুপ্রবেশের প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সামনের নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার এবং অভিবাসন নীতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এদিকে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রকৃত পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে হলে সরকারকে স্বচ্ছ তথ্য তুলে ধরতে হবে। তবেই এই বিতর্কের অবসান সম্ভব।

 

আন্তর্জাতিক/হা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *