ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে ইহুদি বর্ণবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশটি শত্রু আতঙ্কে ভুগছে। এ কারণে তখন থেকেই ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী ও প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। তাদের শত্রুর তালিকায় সর্বশেষ নাম ছিল ইরানের।

গত বছর ও এ বছর দুই দফায় যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু করা দ্বিতীয় দফার যুদ্ধে ইরানের কাছে কার্যত পরাজিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক শক্তি। ইহুদি বর্ণবাদী দেশটি এখন তাদের নতুন শত্রুর সন্ধানে নিয়োজিত রয়েছে এবং তুরস্ককে তাদের পরবর্তী প্রধান শত্রু হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির উগ্রপন্থি মন্ত্রীরা এক বছর ধরেই বলে আসছিলেন যে যুদ্ধ হলে ইসরাইলই তাতে বিজয়ী হবে। তাদের ভাষায় ইরান একটি দুর্বল প্রতিপক্ষ, যার পারমাণবিক কর্মসূচি পিছিয়ে পড়েছে এবং দেশটির আঞ্চলিক মিত্রশক্তিগুলোকে (প্রক্সি) একে একে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। কিন্তু ৪০ দিনের যুদ্ধে ফল কী হয়েছে এবং ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পরাজিত করতে পেরেছে কি না, তা এখন সমগ্র বিশ্বই জানে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অসমাপ্ত রেখে বা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই নেতানিয়াহু ও তার সরকারের উগ্রপন্থি নেতারা ইসরাইলবিরোধী একটি নতুন হুমকির কথা বলা শুরু করেছেন। নতুন এই হুমকির ব্যাপারে তারা এমন ভাষা ব্যবহার করছেন, যা আগে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতো। নতুন উদ্ভাবন করা এই হুমকির সঙ্গে এমন সব রাষ্ট্রকে জড়িত করা হচ্ছে, যাদের রয়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। নতুন শত্রু নির্ধারণে ইসরাইলি নেতাদের ভাষার এই পরিবর্তন অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং তা এসেছে দেশটির একেবারে শীর্ষপর্যায় থেকে।

ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট যিনি আগামী নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ইহুদিদের একটি সম্মেলনে কল্পিত সেই নতুন শত্রুর নামও বলে দিয়েছেন। ‘কনফারেন্স অব প্রেসিডেন্টস অব মেজর আমেরিকান জিউইশ অর্গানাইজেশনস’-এর সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘তুরস্কই হলো নতুন ইরান।’ তিনি আরো একধাপ এগিয়ে বলেন, তুরস্ক ‘সৌদি আরবকে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর এবং পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে একটি বৈরী সুন্নি অক্ষ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।’

এর পাঁচ দিন পর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তুরস্কের নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে নিয়ে একটি পাল্টা ‘ষড়ভুজাকার জোট’ গঠনের ঘোষণা দেন। তার এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল দুটি বিষয়কে মোকাবিলা করা। একটি হলো শিয়া অক্ষ, যেটিকে তারা আগেই ভেঙে দিয়েছে বলে ইসরাইলের দাবি এবং অন্যটি হলো উদীয়মান সুন্নি জোট, যার নেতৃত্বে আছে তুরস্ক।

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের লড়াইটি ছিল এমন একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, যাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু ইসরাইলের পরবর্তী লড়াইটি হবে অনেক বেশি বিস্তৃত ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এক শক্তির বিরুদ্ধে এবং সামরিক শক্তির বিচারে যারা অনেক বেশি উন্নত ও শক্তিশালী অস্ত্রে সজ্জিত। ইসরাইলের দৃষ্টিতে তুরস্ক এই অক্ষশক্তির সম্ভাব্য মূল ভিত্তি এবং কাগজে-কলমে এই অক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য।

ন্যাটো জোটের মধ্যে তুরস্কের রয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী, যাতে প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার সক্রিয় সদস্য আছে এবং এদের পেছনে তুরস্কের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট ২৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। দেশটির নিজস্ব অস্ত্রশিল্প, যার মধ্যে আছে আসেলসান, রকেটসান, তুসাস এবং ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কারম যারা দেশটিকে চালকবিহীন বিমান বা ইউএভি রপ্তানিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানে নিয়ে গেছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ইউএভির চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশই পূরণ করছে তুরস্ক। তাদের সর্বাধুনিক ব্যবস্থা জেটচালিত কমব্যাট ড্রোন ‘কিজিলএলমা’ পরীক্ষামূলক উড্ডয়নকালে রাডার-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে আকাশসীমার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম। তুর্কি নৌবাহিনী ইতোমধ্যেই পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বিশাল এলাকাজুড়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা ইসরাইলের সমুদ্র তীরবর্তী গ্যাসক্ষেত্রগুলোর খুব কাছে অবস্থিত।

এরপর রয়েছে মিসর। ইসরাইলি কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে ১৯৬৭ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানের তুলনা টানেন যখন ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিসরের বিমানবাহিনীকে মাটিতেই ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সামরিক শক্তির পরিসংখ্যানের বিচারে সেই তুলনা করা এখন অবান্তর। বর্তমানে মিসরের নিয়মিত সৈন্যসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার এবং রিজার্ভ সৈন্যসংখ্যা আট লাখ। দেশটি প্রতিরক্ষায় বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এবং আমেরিকান আব্রামস ট্যাংক, ফরাসি রাফাল জেট, রাশিয়ার সু-৩৫ এবং জার্মানিতে তৈরি সাবমেরিনের সমন্বয়ে শক্তিশালী অস্ত্রভান্ডার গড়ে তুলেছে।

গত এপ্রিলের শেষের দিকে মিসরীয় সেনাবাহিনী সিনাই উপদ্বীপে ‘বদর ২০২৬’ নামে বড় আকারের ‘লাইভ-ফায়ার’ বা সরাসরি গোলাবর্ষণভিত্তিক সামরিক মহড়া চালায়। নেতানিয়াহু মিসরের সামরিক শক্তির এই পরিবর্তনের বিষয়টি আমলে নিয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বলেছেন, ‘মিসরীয় সেনাবাহিনী শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং আমাদের সেদিকে নজর রাখতে হবে।’

সৌদি আরব তাদের বিমানবাহিনীতে ‘টাইফুন’ ও ‘এফ-১৫’ যুদ্ধবিমান যুক্ত করে বাহিনীকে শক্তিশালী করে তুলেছে। পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে যাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলি কর্মকর্তাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো পাকিস্তানকে নিয়ে, যাদের কার্যকর পরমাণু অস্ত্রভান্ডার ও তা নিক্ষেপের সক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র আছে এবং যাদের বিমানবাহিনী কিছুদিন আগেই প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে, চীন পাকিস্তান বিমানবাহিনীকে ৩৬টি ‘জে-১০সি’ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে। পাকিস্তানের দাবি, গত বছর ভারতের সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের সময় চীনের এই বিমানগুলো দূরপাল্লার ‘পিএল-১৫’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে অন্তত একটি ‘রাফাল’সহ ভারতের কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।

এসব ঘটনায় ইসরাইলের জন্য সমন্বিত হুমকি তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও মতভেদ আছে। কারণ, আঙ্কারা, কায়রো, রিয়াদ এবং ইসলামাবাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই এবং এই চারটি দেশের সরকার সামরিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করার প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তবে, ইসরাইলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের মতে, তুরস্ক ‘এখন নিজেদের একটি প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ নেতানিয়াহুর তুরস্কবিরোধী জোটের ধারণাকে একটি কার্যকর জোটের চেয়ে বরং তাদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কগুলোরই নতুন মোড়ক হিসেবে অভিহিত করেছেন। চ্যাথাম হাউসের ইয়োসি মেকেলবার্গ এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিনকাস উভয়েই যুক্তি দিয়েছেন, বাইরের কোনো হুমকির ধারণা জিইয়ে রাখার পেছনে বেনেট ও নেতানিয়াহু উভয়েরই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ (যেমনÑনির্বাচন বা ক্ষমতাসীন জোট টিকিয়ে রাখা) রয়েছে। আর আঙ্কারাকে দ্বিতীয় তেহরান হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি তারা এখনো শুধু কথার মধ্যেই সীমিত রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চার দশক ধরে একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক এজেন্ডাকে কেন্দ্র করেই ইরানের ইসরাইলবিরোধী বৈরী মনোভাব গড়ে উঠেছে। কিন্তু তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এমন কোনো আদর্শিক অভিন্নতা বা যৌথ কমান্ড ব্যবস্থা নেই, বরং কায়রোর সঙ্গে ইসরাইলের দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তি এবং পর্দার আড়ালে নিরাপত্তাবিষয়ক বোঝাপড়া রয়েছে, যার কোনোটিই বাতিলের কোনো ইঙ্গিত সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো দেয়নি। অন্যদিকে, সৌদি আরবের সঙ্গেও ইসরাইলের গোপন যোগাযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

কিন্তু এখন পর্যন্ত মিসর, সৌদি আরবসহ তাদের পরিকল্পিত জোটের মধ্যে যে বিষয়টি সাধারণ বা অভিন্ন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলোÑইসরাইলের কর্মকাণ্ড। দেশটি এক বছরেই ওই অঞ্চলের ছয়টি দেশে হামলা করেছে এবং এখন প্রকাশ্যে ‘উদীয়মান কট্টরপন্থি সুন্নি অক্ষ’ নিয়ে কথা বলছে। বেনেট তুরস্কের নেতৃত্বে যে ধরনের জোট গঠনের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তার এই উদ্বেগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেবে কি নাÑতা আঙ্কারা, কায়রো, রিয়াদ বা ইসলামাবাদের সিদ্ধান্তের চেয়ে বরং ইসরাইলের নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপরই বেশি নির্ভর করতে পারে।

মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *