স্পেনের উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় মরক্কো থেকে অভিবাসীদের নজিরবিহীন ঢল নেমেছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৬০ হাজার মানুষ শহরটিতে প্রবেশ করেছেন, যা সেউতার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের সমান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করলেও এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি স্পেন।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিবাসীরা সমুদ্র সাঁতরে, ছোট নৌকায় এবং সীমান্তের ঢেউ-প্রতিরোধক বাঁধ ও কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে দলে দলে সেউতায় প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই তরুণ পুরুষ হলেও নারী ও শিশুদের নিয়েও বহু পরিবার সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছে। অনেককে সীমান্ত অতিক্রমের সময় ‘ভিভা এস্পানিয়া’ (স্পেন দীর্ঘজীবী হোক) স্লোগান দিতেও দেখা গেছে।

এই বিপুল জনস্রোতের মধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সেউতার স্থানীয় প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত অন্তত ৪১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অনেকেই সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময় ডুবে মারা গেছেন, আবার অনেকে জনসমাগমে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সেউতার প্রশাসন মাদ্রিদের কাছে অতিরিক্ত বাহিনী চায়। স্পেন সরকার জানিয়েছে, সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি ডুবুরি দলও মোতায়েন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে বহু অনিয়মিত অভিবাসীকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনাকে দেশের ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে মানব পাচারকারী চক্রকে দায়ী করেছেন। তাঁর দাবি, স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়কে ভুলভাবে প্রচার করে পাচারকারী চক্রগুলো হাজার হাজার মানুষকে সীমান্ত অতিক্রমে উৎসাহিত করেছে।

অন্যদিকে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেইন বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মকানুন উপেক্ষা করে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘটনাটি নিয়ে মন্তব্য করে এটিকে “আগ্রাসনের মতো” বলে উল্লেখ করেছেন।

মরক্কো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করলেও স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর বিষয়েও উভয় দেশ সমন্বয় করছে।

কেন সেউতায় অভিবাসীদের এত বড় ঢল?

সেউতা উত্তর আফ্রিকার মরক্কো উপকূলে অবস্থিত হলেও এটি স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ। আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসীদের প্রধান গন্তব্যগুলোর একটি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক ঢলের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপে উন্নত কর্মসংস্থানের আশা, মরক্কোয় তরুণ ও নারীদের উচ্চ বেকারত্ব, স্পেনের তুলনামূলক অভিবাসীবান্ধব নীতি এবং মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয়তা। পাশাপাশি স্পেন ও মরক্কোর চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

উল্লেখ্য, সেউতা ও মেলিলা উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। ২০২১ সালেও পশ্চিম সাহারা ইস্যুকে ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক বিরোধের সময় সেউতায় কয়েক হাজার অভিবাসী প্রবেশ করেছিলেন। তবে এবারের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সীমান্ত সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *