কয়েক দিন আগেও বাংলাদেশকে নিয়ে এতটা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার তরুণদের বিপক্ষে ডারউইনে প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ। সেই দলেরই অস্ট্রেলিয়ার মূল দলের বিপক্ষে টেস্ট পারফরম্যান্স নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মূল লড়াই শুরু হতেই বদলে গেছে চিত্র। ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়াকে বড় চাপে রেখে ১৫৩ রানের লিড নিয়েছে বাংলাদেশ।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ১৯৮ রানে থামিয়ে প্রথম দিনেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় দিনে ব্যাট হাতে সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে সফরকারীরা। দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৩৫১ রান। হাতে রয়েছে আরও চার উইকেট। মেহেদী হাসান মিরাজ ৩২ এবং হাসান মাহমুদ ১৩ রানে অপরাজিত আছেন। দিনের শেষ ভাগে অস্ট্রেলিয়ার চার পেসার ও নাথান লায়নের সম্মিলিত আক্রমণও বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডারকে ভাঙতে পারেনি।

এই টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় নায়ক পেসার হাসান মাহমুদ। প্রথম দিন ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে ৫৫ রান দিয়ে নিয়েছেন ৬ উইকেট। তাঁর বিধ্বংসী বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস থেমেছে ১৯৮ রানে। স্বাগতিকদের হয়ে সর্বোচ্চ ৭১ রান করেছেন স্টিভ স্মিথ। তাঁর বাইরে অস্ট্রেলিয়ার আর কোনো ব্যাটার ২৫ রানও করতে পারেননি।

বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির বিষয়, নাহিদ রানা ও শরীফুল ইসলাম না থাকলেও তাসকিন আহমেদ ও হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে পেস আক্রমণ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে চাপে ফেলতে পেরেছে।

প্রথম দিনের শেষেও এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। ১৯৮ রানের জবাবে দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৯৬ রান, হারিয়েছিল একটি উইকেট। সাদমান ইসলাম ২০ রান করে ফিরলেও তানজিদ হাসান তামিম ও মুমিনুল হক ক্রিজে ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার লিড তখন নেমে এসেছিল মাত্র ১০২ রানে।

দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই সেই ঘাটতি পূরণ করে বাংলাদেশ। তানজিদ ও মুমিনুল মিলে গড়েন ১০২ রানের জুটি। মুমিনুল ৪৯ রানে ফিরলেও তানজিদ এগিয়ে যান সেঞ্চুরির পথে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭ বল খেলে আটটি চার ও একটি ছক্কার সাহায্যে ১০১ রান করেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম সেঞ্চুরি এটি। তানজিদের ইনিংসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর ধৈর্য। অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের বিপক্ষে তিনি অযথা ঝুঁকি নেননি। ভালো বলকে সম্মান করেছেন, অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছেড়েছেন এবং সুযোগ পেলেই রান নিয়েছেন।

তানজিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ৭৪ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। এরপরও বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাটিং করে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর চাপ ধরে রাখেন। শেষ পর্যন্ত ১২৬ বলে ৮৪ রান করে আউট হন শান্ত।

শান্তর বিদায়ের পর অবশ্য কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ। একসময় ২৯৭ রানে তিন উইকেট ছিল দলের। সেখান থেকে মাত্র ১১ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে ৩০৮ রানে ছয় উইকেট হয়ে যায়। শান্ত ৮৪ রানে ফেরার পর লিটন দাস শূন্য এবং মুশফিকুর রহিম ৩৬ রানে আউট হন।

এই পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ার সামনে ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। দ্রুত আরও কয়েকটি উইকেট নিতে পারলে দিনের শেষটা স্বাগতিকদের পক্ষে যেতে পারত। কিন্তু এবারও বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডার দেখিয়েছে ভিন্ন চিত্র।

মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ সেই চাপ সামলে নেন। মিরাজ ৭৩ বলে ৩২ এবং হাসান ৭৬ বলে ১৩ রানে অপরাজিত থেকে গড়েছেন ৪৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি। দুজন মিলে খেলেছেন ১৪৭ বল। বিশেষ করে হাসানের ধৈর্যশীল ব্যাটিং অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের হতাশ করেছে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে এমন পরিস্থিতিতে অতীতে প্রায়ই দ্রুত উইকেট পড়তে দেখা গেছে। কিন্তু ডারউইনে সেই ধস আর এগোয়নি। বরং মিরাজ ও হাসান মিলে দলের লিড আরও বড় করেছেন।

দুই দিনে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে—হাসান মাহমুদের বোলিং, তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি এবং চাপের সময় মিরাজ-হাসানের প্রতিরোধ। এর সঙ্গে শান্তর ৮৪ রান যোগ হওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ এখন শক্ত অবস্থানে।

প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়ার মূল দলের বিপক্ষে ১৫৩ রানের লিড—বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের পরিবর্তনটা তাই বেশ নাটকীয়।

তবে ম্যাচ এখনো শেষ হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে আবারও বল হাতে দায়িত্ব নিতে হবে বাংলাদেশি বোলারদের। লিড যতটা সম্ভব বড় করে স্বাগতিকদের ওপর চাপ ধরে রাখাই এখন লক্ষ্য।

দুই দিন শেষে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার—অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ এবার শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসেনি, স্বাগতিকদের কঠিন চ্যালেঞ্জও জানাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *