দেশের বাইরে বিভিন্ন শহরে ঘুরে একটি বিষয় আমাকে বারবার ভাবিয়েছে, একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু স্থাপনা, রাস্তা কিংবা আলো দিয়ে তৈরি হয় না; সেই শহরের মানুষের সংস্কৃতি, শিল্পচর্চা ও প্রাণবন্ত জনপরিসরও একটি শহরকে পর্যটনবান্ধব করে তোলে।
সিলেট তো এমনিতেই বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন নগরী। আমাদের ঐতিহাসিক ক্বীন ব্রিজ, সুরমা নদী, নদীর পাড়, সব মিলিয়ে এটি হতে পারে সিলেটের অন্যতম আকর্ষণীয় পাবলিক স্পেস।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্বীন ব্রিজ এলাকায় অব্যবস্থাপনা, ট্রাকের অবস্থান, হর্ন-চিৎকার, মাদকসেবনসহ নানা কারণে জায়গাটির সৌন্দর্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তাই আমার একটি নিজস্ব প্রস্তাব- কিন ব্রিজের উপযুক্ত স্থানে, ব্রিজের নিচের অংশকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করে একটি স্থায়ী ‘সিলেট সাংস্কৃতিক মুক্তমঞ্চ’ তৈরি করা যেতে পারে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন বা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান এখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে দিতে পারে। এরপর সিলেটের নাট্যকর্মী, সংগীতশিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী, নৃত্যশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে।
প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ৯টা বা ১০টা পর্যন্ত হতে পারে, গান
,নাটক ও পথনাটক, আবৃত্তি, নৃত্য, লোকসংগীত ও সিলেটি গান, স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আড্ডা, তরুণ শিল্পীদের পরিবেশনা
সবকিছু হতে পারে পরিকল্পিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সবার জন্য উন্মুক্তভাবে। এতে লাভ হবে অনেক।
প্রথমত, সিলেটের পর্যটকরা ঘুরতে এসে শুধু নদী ও ব্রিজ দেখবেন না, সিলেটের সংস্কৃতিকেও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবেন, দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য তৈরি হবে নিয়মিত পারফরম্যান্সের একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম।
তৃতীয়ত, সন্ধ্যার পর জায়গাটি মানুষের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। ফলে মাদকসেবন, অপরাধ কিংবা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও অনেকাংশে কমে আসতে পারে।
চতুর্থত, কিন ব্রিজের সৌন্দর্য ও আকর্ষণ বহুগুণ বাড়বে। এটি হয়ে উঠতে পারে সিলেটের একটি নতুন পর্যটন আকর্ষণ।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যে জায়গাটিকে আমরা এখন অব্যবস্থাপনার কারণে সমস্যা হিসেবে দেখছি, সেই জায়গাটিকেই সংস্কৃতি ও পর্যটনের সম্পদে পরিণত করা সম্ভব।
বিশ্বের অনেক শহরেই উন্মুক্ত পাবলিক স্পেসকে সংস্কৃতি, সংগীত ও মানুষের মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মেলবোর্নের Federation Square-এ যেমন নিয়মিত উন্মুক্ত সংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পারফরম্যান্স ও কমিউনিটি ইভেন্ট আয়োজন করা হয়।
আমাদের সিলেটেও এমন একটি উদ্যোগ কেন হবে না?
আমার এই প্রস্তাবটি হয়তো বাস্তবায়নের আগে অনেক কিছু যাচাই করতে হবে , নিরাপত্তা, নদীর তীরের স্থাপনা, যান চলাচল, পরিবেশ, শব্দ নিয়ন্ত্রণ, বর্ষাকাল, পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমতি, সবকিছুই পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।
কিন্তু আইডিয়াটা নিয়ে আলোচনা শুরু করা তো যেতেই পারে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন চাইলে সংস্কৃতিকর্মী, স্থপতি, পরিবেশবিদ, পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি ছোট কমিটি করে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে পারে।
হয়তো একদিন, ক্বীন ব্রিজের নিচে ট্রাকের হর্ন নয়, শোনা যাবে সিলেটি গান। চিৎকার-চেঁচামেচির বদলে হবে নাটক ও আবৃত্তি।
অন্ধকার কোণের বদলে থাকবে আলো ও মানুষের সমাগম।
আর সুরমার পাড়ে দাঁড়িয়ে একজন পর্যটক বলবেন,
‘এটাই তো সিলেট!’ এটি কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাব নয়।
এটি আমার শহরকে আরও সুন্দর, নিরাপদ, সংস্কৃতিমুখী ও পর্যটনবান্ধব করার একটি নাগরিক চিন্তা।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। ভালো কোনো আইডিয়া বাস্তবায়িত হলে কৃতিত্ব কার, সেটা বড় কথা নয় আমাদের শহরটা একটু সুন্দর হলেই সেটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।
লেখক: সাংবাদিক



