জনৈক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের একটি সাম্প্রতিক লেখায় বলা হয়েছে, তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু হওয়ার আগেই আলোচনায় এসেছে তাঁর নিউইয়র্কের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে তৈরি হওয়া সীমাবদ্ধতা। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশসংক্রান্ত পুরোনো অভিবাসন বিধিনিষেধ এখনো যে কার্যকর রয়েছে, তা এই সংক্ষিপ্ত সফরসূচি থেকেই স্পষ্ট।
জাতিসংঘের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে আসার সুযোগ পেলেও মার্কিন অভিবাসন নীতির কারণে নিউইয়র্কের বাইরে তাঁর চলাচলের স্বাধীনতা নেই বললেই চলে।
মার্কিন প্রশাসন হয়তো সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করার কথা ফলাও করে প্রচার করেনি, কিন্তু ৯ দিনের সফর ৪ দিনে নেমে আসাই বলে দেয় পর্দার আড়ালে বাস্তবতা কতটা কঠোর। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সফর করার কথা ছিল। সেই তালিকায় সানফ্রান্সিসকো সফর, প্রযুক্তি খাতের ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক এবং প্রবাসীদের সঙ্গে বড় জমায়েতের কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিশাল পরিকল্পনা পুরোপুরি বদলে ফেলা হয়েছে।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতেই দেশের পথে রওনা দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ সানফ্রান্সিসকো সফর পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে এবং সফরসঙ্গীদের বহরও ছোট করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘সময় ব্যবস্থাপনা’ ও ‘রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো’র মতো গতানুগতিক কারণ হিসেবে দেখানো হলেও, এর আসল রহস্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। যদি ব্যয় ও সময় কমানোই মূল লক্ষ্য হতো, তবে শুরুতেই কেন এমন অপরিকল্পিত ও দীর্ঘ সফরসূচি তৈরি করা হলো?
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের বেড়াজাল এড়িয়ে সানফ্রান্সিসকো যাওয়ার সাহস বা সুযোগ যে তাঁর নেই, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
কয়েক সপ্তাহ আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তারেকের সাথে সাক্ষাতের জন্য “অপেক্ষা” করছেন বলে নানা প্রচারণা চালানো হয়েছিল; প্রথমে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের একটি বক্তব্য এবং পরবর্তীতে একটি চিঠি প্রকাশের মাধ্যমে এই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। নিউ ইয়র্কে ‘বোয়িং গ্লোবাল’-এর প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডন নেলসনের সাথে তাঁর সাক্ষাতের কথাও রয়েছে।
কিন্তু যদি তাঁরা উভয়েই ট্রাম্পের নৈশভোজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পানও, তবে কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নয়, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে সর্বোচ্চ একটি ফটো সেশন হতে পারে, যা অন্য সকলের সাথেই হয়ে থাকে।
বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্যিক আলোচনা কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৈশভোজে উপস্থিত থাকার চটকদার প্রচার চালানো হলেও, আদতে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই সফরের ওজন যে অত্যন্ত সীমিত, তা এই কাটছাঁট করা সূচি থেকেই প্রমাণিত হয়।
তারেক রহমানের নাগরিক সংবর্ধনা উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি প্রস্তাবিত নাগরিক সংবর্ধনা আয়োজনে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ মার্কিন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এই বিশাল অঙ্কের আর্থিক কেলেঙ্কারি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—নয় দিনের বিশাল কর্মপরিকল্পনা কেন শেষ মুহূর্তে চার দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে রূপ নিল? মার্কিন অভিবাসন সংক্রান্ত পুরোনো বিধিনিষেধের যে বেড়াজাল রয়েছে, তার সঙ্গেই কি এই সফর সংক্ষিপ্ত করার সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই?
সরকারের সাজানো ব্যাখ্যার আড়ালে এই নাটকীয় পরিবর্তনই প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চে এই সফর বড় কোনো কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে কেবল নিয়মরক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
এ নিয়ে সচেতন মহলের অভিমত হচ্ছে, তারেক রহমানের নাম ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই তালিকায় আল-কায়েদা, আইএসআইএস এর মতো দলগুলো থাকে, কোনো ব্যক্তির নাম থাকে না।
তবে তার ভ্রমণ নিয়ে আলোচনার পেছনে দুটি আলাদা কারণ আছে।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অভিবাসন আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অনির্ধারিত সন্ত্রাসী সংগঠনের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। এটি তৃতীয় স্তর, অর্থাৎ পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন নয়, কিন্তু অভিবাসন আইনে কেউ যদি ওই দলের সদস্য হয়, তাহলে তার আবেদন আলাদাভাবে কঠোর যাচাই করা হয়। এটি দলকে সন্ত্রাসী হিসেবে বিদেশি সন্ত্রাসী তালিকায় দেওয়ার মতো এক বিষয় নয়।
২০০৮ সালে ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি একটি গোপন বার্তায় তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ স্থগিত করার জন্য নিরাপত্তা উপদেষ্টা মতামত চেয়েছিলেন। তিনি অভিবাসন আইনের ২১২(চ) ধারা এবং রাষ্ট্রপতির ঘোষণা ৭৭৫০ এর অধীনে এই সুপারিশ করেন। কারণ হিসেবে গুরুতর রাজনৈতিক দুর্নীতির কথা বলা হয়েছিল।
এই ধরনের মতামত থাকলে সাধারণ ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে জটিলতা হয়, ভিসা বাতিল হতে পারে বা বিশেষ অনুমতি লাগতে পারে।
সাধারণ নাগরিক হিসেবে পর্যটন বা ব্যবসায়িক ভিসার আবেদন করলে এই ইতিহাসের কারণে প্রবেশের অযোগ্যতা আসতে পারে এবং অতিরিক্ত যাচাই বা বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে।
তবে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান হিসেবে অথবা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যাওয়ার জন্য ভ্রমণ হলে ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য। জাতিসংঘের সদর দপ্তর চুক্তি অনুযায়ী আয়োজক দেশকে যাতায়াত এবং জাতিসংঘ এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দিতে হয়। তখন চলাচল সাধারণত নিউইয়র্কের জাতিসংঘ এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী তিনি এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আছেন বলা হচ্ছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম দাবি করছে, তারেক রহমানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল আছে এবং তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ নির্ধারিত এলাকার বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন না।
আরেকটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু হওয়ার আগেই সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল নিউইয়র্কের বাইরে তার চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা। তার সংক্ষিপ্ত সফরসূচি থেকেই এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পুরনো নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর আছে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী তার প্রথমে ২১ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় দিনের সফর, সান ফ্রান্সিসকো যাওয়া এবং প্রবাসীদের সাথে বড় সমাবেশের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু পরে সেটা ২১ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দিনে নামিয়ে আনা হয় এবং সান ফ্রান্সিসকো সফর বাতিল করা হয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোনো ব্যক্তির ভিসা বা প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে না, গোপনীয়তার কারণে। তাই সরকারি ওয়েবসাইটে তার নামে কোনো প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি পাবেন না।
কিন্তু বাস্তবে যদি পুরনো নিরাপত্তা উপদেষ্টা মতামত এখনো সক্রিয় থাকে, তাহলে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের জন্য তিনি যে বিশেষ ভিসা পান, সেটা দিয়ে শুধু জাতিসংঘ এলাকাতেই চলাফেরা করতে পারবেন, নিউইয়র্কের বাইরে বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো রাজ্যে যেতে পারবেন না। এটাই এখন আলোচিত সীমাবদ্ধতা।



