নিরাপদ থাকা নয়, নিরাপদ বোধ করাটাই বড় কথা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না খারাপ, এই প্রশ্নের উত্তর আমরা সাধারণত পরিসংখ্যান দিয়ে খুঁজি। কতটি অপরাধ হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় পরিস্থিতি কেমন, এসব দিয়ে রাষ্ট্র তার সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব দেয়।

 

কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ কোনো পরিসংখ্যানের বিষয় নয়।

 

একজন মানুষ রাতে বাড়ি ফেরার সময় নিরাপদ বোধ করছেন কি না, সেটি নির্ভর করে তাঁর চারপাশের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর। তিনি দেখছেন, অপরাধ হলে পুলিশ কী করছে, অভিযুক্ত কে হলে তদন্ত কতদূর যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত বিচার হচ্ছে কি না।

 

এই জায়গাতেই মূল পার্থক্যটি।

 

অনিরাপদ থাকা আর অনিরাপদ বোধ করার মধ্যে অনেক তফাৎ রয়েছে। আর একটি সরকারের জন্য দ্বিতীয়টি কখনো কখনো প্রথমটির চেয়েও বড় বিপদ।

 

সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা এই বিষয়টি বোঝার জন্য যথেষ্ট।

 

প্রথমটি রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুর। মুখোশধারীদের একটি দল সেখানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। পরে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

গ্রেপ্তার হওয়া নিঃসন্দেহে তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু নাগরিকের প্রশ্ন এখানেই শেষ হয় না। বরং শুরু হয়।

 

যারা সামনে থেকে ভাঙচুর করেছে, তারাই কি পুরো ঘটনার পরিকল্পনাকারী? নাকি তারা ছিল শুধু বাস্তবায়নকারী? অর্থ কে দিয়েছে? নির্দেশনা কে দিয়েছে? হামলার পেছনে কোনো সংগঠিত পরিকল্পনা ছিল কি না?

 

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

 

কারণ একটি অপরাধের হাত-পা ধরা আর অপরাধের মাথা খুঁজে বের করা এক জিনিস নয়।

 

এরপর রাজধানীর ইসিবি চত্ত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা সামনে এল। ভবনটি নিয়ে বিরোধের কথা জানা যাচ্ছে, চাঁদা দাবির অভিযোগও উঠেছে। সালমান মুক্তাদির ঘটনাটিকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। তবে অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে।

 

এখানেও একই প্রশ্ন সামনে আসে: কারা হামলা করেছে এবং কেন করেছে?

 

দুটি ঘটনার চরিত্র এক নয়। একটি আরেকটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, এমন দাবিও করা যায় না। কিন্তু নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে দুটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল আছে।

 

ঘটনার পর রাষ্ট্র কতটা গভীরে যাবে?

 

শুধু যারা হাতুড়ি বা লাঠি নিয়ে সামনে ছিল, তাদের ধরা হবে? নাকি তদন্ত গিয়ে পৌঁছাবে পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও নির্দেশদাতার কাছে?

 

এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে নাগরিক ঘটনাটিকে কীভাবে দেখবেন।

 

ধরা যাক, একজনকে টাকা দিয়ে ভাঙচুর করতে পাঠানো হলো। তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। আইন প্রয়োগের প্রাথমিক কাজটি হলো। কিন্তু যদি টাকা দেওয়া ব্যক্তি বা নির্দেশদাতা অদৃশ্যই থেকে যায়, তাহলে নাগরিকের কাছে সেটি পূর্ণাঙ্গ বিচার বলে মনে নাও হতে পারে।

 

এখানেই নিরাপত্তার সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সম্পর্ক।

 

মানুষ সব অপরাধ বন্ধ হয়ে যাক, এমন আশা করে না। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই তা পারে না। মানুষ বরং জানতে চায়, অপরাধ হলে রাষ্ট্র কী করবে।

 

এই প্রশ্নের উত্তর যদি হয়, ‘অপরাধী যে-ই হোক, তদন্ত হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিচার হবে’, তাহলে নাগরিকের আস্থা তৈরি হয়।

 

আর যদি ধারণা তৈরি হয়, ‘সামনে থাকা লোক ধরা পড়বে, কিন্তু ক্ষমতাবান কেউ জড়িত থাকলে শেষ পর্যন্ত কিছু হবে না’, তাহলে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।

 

অর্থাৎ নিরাপত্তাবোধের সঙ্গে অপরাধের সংখ্যার যতটা সম্পর্ক, তার চেয়ে বেশি সম্পর্ক অপরাধের পরিণতির সঙ্গে।

 

একজন নাগরিক হয়তো জানেন না তাঁর এলাকায় বছরে কতটি ছিনতাই হয়েছে। কিন্তু তিনি জানেন, পাশের দোকানে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল কি না এবং অভিযোগ করার পর কী হয়েছিল। তিনি জানেন, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি এলাকায় দাপট দেখালে পুলিশ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।

 

রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর ধারণা তৈরি হয় এসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতা দিয়ে।

 

এই কারণেই শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে জনমনের নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলা করা যায় না।

 

ধরা যাক, অপরাধের হার আগের চেয়ে কমেছে। তবু যদি কয়েকটি দৃশ্যমান ঘটনায় মানুষ দেখে যে অপরাধীরা সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে, তাহলে সেই কয়েকটি ঘটনাই জনমনে বড় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে।

 

আজকের ডিজিটাল যুগে এই প্রভাব আরও দ্রুত।

 

একটি হামলার ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ঘটনাটি নিজের চোখে না দেখেও তার ছবি দেখে। এরপর সেই ঘটনার সঙ্গে নিজের এলাকার অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নেয়।

 

ফলে একটি অপরাধ আর শুধু একটি অপরাধ থাকে না। সেটি মানুষের মনে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে একটি প্রশ্ন তৈরি করে।

 

এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতে হয় কাজ দিয়ে।

 

বক্তৃতা দিয়ে নয়।

 

অপরাধের পর দ্রুত তদন্ত করতে হবে। শুধু গ্রেপ্তার করলেই হবে না, তদন্তকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর যদি তদন্তে পরিকল্পনাকারী বা অর্থদাতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়, তাদেরও বাদ দেওয়া যাবে না।

 

তবে এর বিপরীত ভুলটিও করা যাবে না। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বানানো কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা ন্যায়বিচার নয়। রাষ্ট্রের কঠোরতা হতে হবে প্রমাণনির্ভর।

 

আবার রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্তের ঢালও না হয়।

 

এই ভারসাম্যটিই রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা।

 

কারণ একজন সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত একটি সহজ জিনিস দেখতে চান: আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান?

 

এই প্রশ্নের উত্তর যদি তিনি হ্যাঁ হিসেবে পান, তাহলে অপরাধের একটি ঘটনা তাঁর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করলেও রাষ্ট্রের ওপর আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে না।

 

কিন্তু উত্তর যদি না হয়, তাহলে সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার থাকে না। সেটি রাষ্ট্রের বৈধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে পরিণত হয়।

 

এখানেই সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে।

 

সরকার সব অপরাধ বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু সরকার চাইলে অপরাধীর জন্য শাস্তির নিশ্চয়তা এবং নাগরিকের জন্য বিচারের নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

 

একজন নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ আসলে এই নিশ্চয়তা থেকেই আসে।

 

তাই সরকারের সামনে আজ সবচেয়ে জরুরি কাজ মানুষকে বোঝানো নয় যে তারা নিরাপদ।

 

এমনভাবে কাজ করা, যাতে মানুষ নিজের চোখে নিরাপত্তার প্রমাণ দেখতে পায়।

 

হামলার পর প্রকৃত অপরাধী ধরা পড়ছে।

 

চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলে তদন্ত হচ্ছে।

 

ভাঙচুরের পেছনে কারা ছিল, তা বের করা হচ্ছে।

 

রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, অপরাধ প্রমাণিত হলে বিচার হচ্ছে।

 

এই দৃশ্যগুলোই নাগরিককে সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা দেয়।

 

কারণ রাষ্ট্রের শক্তি বক্তৃতায় নয়, আইনের প্রয়োগে দেখা যায়।

 

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, দেশে অপরাধ কতটা আছে।

 

প্রশ্ন হলো, অপরাধ ঘটলে নাগরিকের মনে কী তৈরি হচ্ছে।

 

ভয়, নাকি আস্থা?

 

একটি সরকার সব অপরাধ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে, যেখানে একজন মানুষ বিপদে পড়েও অন্তত এই বিশ্বাসটুকু ধরে রাখতে পারেন:

 

“আমার সঙ্গে অন্যায় হলে আমি একা নই। রাষ্ট্র আমার পাশে থাকবে।”

 

এই বিশ্বাসটিই নাগরিকের প্রকৃত নিরাপত্তা।

 

আর এই বিশ্বাস হারিয়ে যাওয়া শুরু হলে, পরিসংখ্যান যতই স্বস্তিদায়ক হোক, সরকারের সতর্ক হওয়ার সময় তখনই।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৮
  • ১১:৪৮
  • ৪:০৬
  • ৫:৫১
  • ৭:০৪
  • ৫:৪১