শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের ভোগান্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশের পর অনলাইনে নানা ধরনের আক্রমণের শিকার হয়েছেন সিলেটের চিকিৎসক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডা. ওরাকাতুল জান্নাত। তার রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয়, চিকিৎসক পরিচয় এবং ভিডিও প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিভিন্ন ব্যক্তি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন।
গত ১ অক্টোবর ওমরাহ শেষে দেশে ফেরার পর নিজের ফেসবুক পেজে লাইভে এসে বিমানবন্দরের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরেন ডা. জান্নাত। ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?’ ক্যাপশনে দেওয়া ওই ভিডিওতে তিনি ট্রলির সংকট, লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, ওমরাহফেরত যাত্রীদের জমজমের পানি না পাওয়া, বয়স্ক ও শিশুদের বসার ব্যবস্থা না থাকা এবং বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পথে দীর্ঘ সারিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
তার ভাষ্য, ট্রলির জন্য ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে এবং বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বের হতে তার প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে। এ ছাড়া যাত্রীদের সহায়তায় দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাউকে সহজে পাওয়া যায়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে।
বিএনপিপন্থী প্রবাসী হিসেবে পরিচিত জাহাদ উদ্দিন তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার মোনাফেকদের এসব মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ। ওরাকাতুল জান্নাত নামের এই মহিলাটিকে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিন, দেখবেন আসল কাহিনী ১০০% বেরিয়ে আসবে।”
জিয়া সাইবার ফোর্সের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে পরিচিত মো. আবদুস সালাম তার পোস্টে লেখেন, “ডা: ওরাকাতুল জান্নাত। একজন নিরপেক্ষ যাত্রী। ওমরা কইরা আইসাই এয়ারপোর্টে বইসা বাংলাদেশকে শাপ শাপান্ত করেছেন। তার বাবা সিলেট-২ আসনের জামাতের প্রার্থী। মা জামাতের মহিলা সংসদ সদস্য। স্বামী সাবেক শিবির সভাপতি, সিলেট।”
ওই পোস্টে তিনি আরও লেখেন, “সে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া পাপ বলেছেন। আর আমি বলি একটা রাজাকার পন্থি ফ্যামিলিতে জন্ম নিয়েই সবচেয়ে বড় পাপ করেছিস বোন। পাকিস্থানে চলে যান। গিয়ে দেখেন কেমন মজা।”
পোস্টটির শেষাংশে ডা. জান্নাত ও তার মতো ব্যক্তিদের উদ্দেশে আরও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ের ৬ নম্বর ভানোর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্যসচিব হিসেবে পরিচিত সাজেদুর রহমান শান্তু তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “সুন্দর লেবাসের আড়ালে জঙ্গি কাজ… জাশি মানেই চোর।”
বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে পরিচিত কাদের মাওলা তার পোস্টে ডা. জান্নাত ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে এনজিওর আড়ালে জঙ্গি সংগঠন পরিচালনার অভিযোগ করেন। তিনি লেখেন, “এনজিও আড়ালে জ/ঙ্গি সংগঠন। সূত্র জানায়, ফিলিপাইনে বসবাসরত আবু হুরায়রা ও তার স্ত্রী ওরকাতুল জান্নাত এই এনজিও পরিচালনা করতো। বাংলাদেশে অবস্থান করে রেদোয়ান নামে একজন এই প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করতো।”
তিনি আরও দাবি করেন, “অ্যাডুকেশন, ওরফান, ওয়াশ, রিহাবিলেশন, কোরবানি প্রজেক্টের নামে তুরস্ক, ইউএস হেল্পিং ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ইসলামিক কাউন্সিল অব নর্থ আমেরিকা, হিউম্যান এইড-ইইউ, মুসলিম এইড-সুইডেন, ডব্লিউইএফএ, কেয়ার ফর আদার ও হর্ন অব আফ্রিকার মতো সংস্থা থেকে অর্থ সংগ্রহ করতো তারা।”
তবে কাদের মাওলার এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জিয়া সাইবার ফোর্সের প্রধান সমন্বয়কের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত জুল আফরোজ তার পোস্টে আরও একটি অভিযোগ তোলেন। তিনি লেখেন, “সরকার পতনের নীল নক্সা করার জন্য একটি দলের নারী পুরুষ সহ ৩০/৪০ জন সৌদি আরব গিয়েছিলো। সেখানে অন্য দেশ থেকে কিছু লোক হাজির হয়েছিলো। তাদের পরিকল্পনা ছিলো একটা ইসু তৈরী করতে হবে। তারা ইচ্ছা করে এয়ারপোর্টে ঝামেলা তৈরী করেন। এত সহজে পারবেন না। একটু ধীরে চলেন।”
বিএনপির প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে পরিচিত জাহিদুল ইসলাম তার পোস্টে ডা. জান্নাতকে নিয়ে আরও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। তিনি লেখেন, “সে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া পাপ বলেছে। রাষ্ট্রদোহী সে। আর আমি বলি একটা রাজাকার ফ্যামিলিতে জন্ম নিয়েই সবচেয়ে বড় পাপ করেছিস মাতারি। গোলাম আজমের বীজ ওরাকা, পাকিস্থানে চলে যা। গিয়ে দেখ কেমন মজা।”
এদিকে জিয়া সাইবার ফোর্সের প্রধান সমন্বয়ক গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) ওয়াহিদ উন নবী ফেসবুকে একটি লাইভে আসেন। ওই লাইভের ক্যাপশনে লেখা হয়, “ভুয়া ডাক্তার ওরাকাতুল জান্নাত জামায়াতের স্লিপিং ফাইটার।”
এতে ডা. জান্নাতের চিকিৎসক পরিচয় নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে। এর জবাবে ফারহানা মিতু নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী পোস্ট দিয়ে ডা. জান্নাতের বিভিন্ন ডিগ্রির প্রমাণ হিসেবে কিছু ছবি প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, “সামান্য একটা পোস্ট দিয়েছিলাম ডা: ওরাকাতুল জান্নাতকে নিয়ে। বিএনপির শিক্ষিত ও অশিক্ষিত চামুচেরা এমনভাবে কমেন্ট করতে থাকছে যে রীতিমতো অবাক না হয়েই পারলাম না। উনি যে ডক্টর তার প্রমাণ গুলো দিলাম। আশাকরি যারা অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন তারা ধারণা লাভ করবেন।”
ডা. ওরাকাতুল জান্নাতের পারিবারিক পরিচয়ের সূত্রে জানা যায়, তার বাবা আবদুল হান্নান সিলেট জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এবং সিলেট-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন। তার মা মাহফুজা হান্নান জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।
চিকিৎসার পাশাপাশি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবেও পরিচিত ডা. জান্নাত। ফেসবুকে তার অনুসারীর সংখ্যা ৯ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। ইউটিউবেও তার ১০ হাজারের বেশি সাবস্ক্রাইবার রয়েছে।
সোর্স- বেঙ্গল লেন্স



