শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট বরাদ্দে জামায়াতপন্থী দুই প্রভোস্টের পক্ষপাত এবং শিক্ষার্থীদের ‘জোরপূর্বক’ হল থেকে নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।
রোববার(০৪ অক্টোবর) বিকেলে উপাচার্যের কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানান ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাঈম সরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক জামাল উদ্দিন ও অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম আবাসিক হল বিজয়-২৪ হল ও সৈয়দ মুজতবা আলী হলের প্রভোস্ট থাকাকালীন হলের নীতিমালা ও সিট বরাদ্দের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সিট দেয় বলে বৈঠকে ছাত্রদল অভিযোগ করে বলে জানান শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাঈম সরকার।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট হলের শিক্ষার্থীদের জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ‘জোরপূর্বক’ হল থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ তুলে বৈঠকে উপাচার্যের কাছে গত ১২মে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রমের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চান বলে জানান শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক।
এসময় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে হলের সিট বরাদ্দে দিতে হবে বলে বৈঠকে দাবি জানান ছাত্রদল নেতারা।
শাখা ছাত্রদলের নাঈম সরকার বলেন, “জামায়াতপন্থী সাবেক দুই প্রভোস্টের বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুসরণ না করে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সিট বরাদ্দ দেয়। একইসাথে ২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট হলত্যাগের ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটর করতে হবে।”
“আমরা ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ে হল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও নিয়মতান্ত্রিক ক্যাম্পাস চাই। শাবি ছাত্রদল সেটার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।”
অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন প্রভোস্টদের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বিজয়-২৪ হলের সাবেক প্রভোস্ট অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, “আমার দায়িত্ব থাকাকালে হলের সিট বণ্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট অনুমোদিত নীতিমালা অনুযায়ী হয়েছে। এ সিট বণ্টনের প্রক্রিয়ায় বর্তমান প্রক্টর মহোদয়, তৎকালীন ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা (সিট বণ্টন কমিটির সভাপতি) এবং হলগুলোর তৎকালীন প্রভোস্টগণ সম্পৃক্ত ছিলেন। সুতরাং, সিট বণ্টনে আমার কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে হলে ওঠানোর সুযোগ বা ভূমিকা ছিল না।”
“তাই কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া প্রকাশ্যে একজন শিক্ষককে এভাবে ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করা অনাকাঙ্ক্ষিত। আশা করি, প্রশাসন বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা নিয়ে ন্যায়সংগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”
একই অভিযোগের বিষয়ে সৈয়দ মুজতবা আলীর হলের সাবেক প্রভোস্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “যা সিট দেওয়া হয়েছে, নিয়মমাফিক দেওয়া হয়েছে। ছাত্র উপদেষ্টার মাধ্যমে সে সিটগুলো আসছে, আমরা তাদেরই সিট দিয়েছি।”
তৎকালীন সিট বরাদ্দ কমিটির সভাপতি ও সদস্যের বক্তব্য
হলের সিট বণ্টন ও ছাত্রশিবিরকে সিট দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তৎকালীন সিট বরাদ্দ কমিটির সভাপতি ও ছাত্র উপদেশ ও নিদর্শনা পরিচালক অধ্যাপক ড. এছাক মিয়া বলেন, “সভাপতি হিসেবে সিট বণ্টন প্রক্রিয়াটি আমার মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছিল। সাধারণত আমরা বিভিন্ন বিভাগের (ডিপার্টমেন্ট) মাধ্যমেই সিট বরাদ্দ দিয়েছি। হলে বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট) অনুযায়ী সিট সংখ্যা জেনে বিভাগগুলোকে চিঠি দেওয়া হতো, যাতে তারা যোগ্য শিক্ষার্থীদের তালিকা পাঠায়।”
তিনি আরও বলেন, “এখন অনেক সময় যেটা হয় আরকি, যেটা হইছে বলে-এটা আমার কাছে প্রমাণ নাই, কিন্তু আমার মনে হইছে আরকি, যেটা হচ্ছে খুব রেয়ার, দুই-একটা কেস, যেমন ধরো খুব গরিব দুই-একটা স্টুডেন্ট আসে, হয়তো তাদের(তৎকালীন প্রভোস্ট) কাছে, কিন্তু এটা আমার কাছে প্রমাণ নাই, হয়তো তারা দিতে পারে।
কিন্তু একটা অনিয়ম যেটা শাহপরান হলে হইছে, এটা আমাদের কাছে-এটা তো তোমরা সবাই জানো যে ইল্লিগালি(অবৈধভাবে) অনেক ছাত্র উঠে পড়ছিল, পরে ওদেরকে সামহাউ(কোনভাবে) ঠেকানো হইছে। তারপরে ছাত্রদলকে কিছু সিট দেওয়া হয়েছিল, তাও এটা পরে ব্যালেন্স করা হইছে, নির্বাচনের(শাকসু) স্বার্থে আরকি। প্রশাসনের পারমিশনে করা হইছে, যে স্যার ওদেরকে কিছু সিট দিলে তারা যদি নির্বাচনে আসে। সাধারণ ছাত্ররা যেহেতু নির্বাচন করতে চায়, তারা চায় না(ছাত্রদল), ছাত্রদলকে কিছু সিট দিলে তারা যদি নির্বাচনে আসে। এটা ভিসি ও প্রো-ভিসি স্যার(তৎকালীন) যখন বলছে, তখন হয়তো অল্প কয়টা সিটকে রেগুলারাইজ করে তাদেরকে দেওয়া হইছে”
অন্য কোনো ছাত্র সংগঠনের সিট দখলের অভিযোগ খারিজ করে তিনি বলেন, “অন্য কেউ অন্যায়ভাবে সিট দখল করেছে-এমন কোনো প্রমাণ বা তথ্য আমার কাছে নেই। এমন কিছু ঘটে থাকলে আমি তাৎক্ষণিকভাবে আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতাম। আমার জানামতে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।”
বিভিন্ন সংগঠনের সিট সংক্রান্ত চাপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সিট বণ্টনের সময়ে ছাত্রদল, জাতীয় ছাত্রশক্তি কিংবা শিক্ষকদের একাংশ নানাভাবে শিক্ষার্থীদের দিয়ে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করত এবং আমাদের তা সামলাতে হতো। তবে ছাত্রশিবির কখনোই সিট বরাদ্দের জন্য আমার কাছে আসেনি। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, ‘আমাদের সিট দিতে হবে’-এমন কোনো দাবি নিয়ে তারা কখনোই আমার মুখোমুখি হয়নি।”
এবিষয়ে তৎকালীন সিট বরাদ্দ কমিটির সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোখলেছুর রহমান বলেন, “তাদের(ছাত্রদল) অভিযোগ কি বা বক্তব্য কি, এটা তাদের বিষয়। এটা নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করবো না। প্রভোস্টরা হলে কি করেছেন সেটা তো আমি জানি না। কিন্তু সেন্ট্রাল কমিটি নিরপেক্ষতার সাথেই মোটামুটি সিট বন্টন করেছে এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই।”
শিবির সভাপতির বক্তব্য
হল থেকে ‘জোরপূর্বক’ বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাসুদ রানা তুহিন বলেন, “ছাত্রদল যে অভিযোগগুলো করেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। এরসঙ্গে ছাত্রশিবিরের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। ওই দিনের ঘটনার সব ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত বিষয়টি স্পষ্ট হবে।”
ছাত্রদলের হলের সিট বন্টনের অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, “ছাত্রদল দুটি হলের বিষয়ে অভিযোগ করলেও শাহপরাণ হলের বিএনপিপন্থী তৎকালীন প্রভোস্টের মাধ্যমে অবৈধভাবে ৩০টির মত সিট বন্টনের বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই। এবং সে সিটগুলো ছাত্রদলকেই দেওয়া হয়ছিল। এতে বুঝা যায়, তারা শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনীতি করতে আসেনি, বরং রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রদর্শন করতে আসছে।”
তিনি আরও বলেন, “ছাত্রদল এখন অবৈধভাবে হলগুলোতে তাদের নেতাকর্মীদের উঠাচ্ছে। এটা যাতে ডাকা পড়ে যায়, শিক্ষার্থীদের মোটিভ ও অবজারভেশনে ব্যাঘাত ঘটানো যায়, সেজন্য ছাত্রদল এসময় এ মিথ্যা রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।”
উপাচার্যের বক্তব্য
ছাত্রদলের বৈঠকের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলেন, “আমি নতুন দায়িত্বে এসেছি। তারা (ছাত্রদল) আগের প্রশাসনের সময়ের একটি বিষয়ে অভিযোগ করেছে। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”



