হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এই দেশের কোটি প্রবাসীর কান্না, ঘাম আর অভিশাপের নাম। বছরের পর বছর ধরে এখানে লাগেজ কাটা হয়েছে, লাগেজ চুরি হয়েছে, প্রবাসীকে হয়রানি করা হয়েছে, দালালরা টাকা খেয়েছে। সরকার বদলায়, মন্ত্রী বদলায়, কিন্তু এয়ারপোর্টের চরিত্র বদলায় না। এই অন্ধকারের মধ্যে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ আলোর মতো আবির্ভাব হয়েছিল একজনের — নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে এম আবু নওশাদ, যাকে মানুষ চেনে নওশাদ খান নামে।
ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছিল, এয়ারপোর্ট ঠিক করো। সেই নির্দেশে ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ খানকে আনা হলো। তিনি যা করলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি। তিনি প্রটোকল ভেঙে স্কুটার নিয়ে টার্মিনাল থেকে টার্মিনালে ঘুরতেন। রাত ২টায় লাগেজ বেল্টের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কোনো কর্মচারী যাত্রীর কাছে বকশিশ চাইলেই সাথে সাথে জরিমানা। কোনো দালাল ধরলেই ১৫ দিনের জেল। ক্যান্টিনে বেশি দাম রাখায় সিলগালা। ওয়াশরুমে টাকা চাওয়ায় ক্লিনারকে জরিমানা। লাগেজ কাটার প্রমাণ পেয়ে বিমান বাংলাদেশের কর্মচারীকে হাতেনাতে ধরেছিলেন তিনি। সেই ভিডিও কোটি মানুষ দেখেছে।
প্রবাসীরা তাকে নাম দিয়েছিল, “এয়ারপোর্টের ফাটাকেস্ট”, “প্রবাসীর ত্রাতা”। টিকটকে, ফেসবুকে তার ভিডিওতে লাখ লাখ কমেন্ট, “অবশেষে একজন মানুষ পাওয়া গেছে”। সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীর প্রবাসীরা দেশে নেমে প্রথমবার মনে করেছিল, রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। কিন্তু আজ, ২০২৬ সালের অক্টোবরে এসে প্রশ্ন উঠছে, সেই জাঁদরেল ম্যাজিস্ট্রেট এখন কোথায়?
আমরা খোঁজ নিয়ে জানলাম, তিনি এখনো শাহজালাল বিমানবন্দরেই আছেন। বদলি হননি। চেয়ার একই আছে, নামপ্লেট একই আছে। কিন্তু মানুষটা আর নেই। তার সেই জাঁদরেল ভূমিকা আর নেই। তার হুংকার আর নেই। তার স্কুটারের শব্দ আর শোনা যায় না। কেনো?
কারণ বাংলাদেশে একজন সৎ অফিসার কখনো সিন্ডিকেটের চেয়ে শক্তিশালী নয়।
শাহজালাল বিমানবন্দরে অন্তত ১২টি সিন্ডিকেট কাজ করে। লাগেজ হ্যান্ডলিং সিন্ডিকেট, ট্রলি সিন্ডিকেট, ক্যান্টিন সিন্ডিকেট, ক্লিনিং সিন্ডিকেট, আনসার-পুলিশের একাংশের সিন্ডিকেট, দালাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটগুলো বছরে হাজার কোটি টাকা কামায়। এই টাকার ভাগ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত যায়, এমন অভিযোগ বহু পুরনো।
নওশাদ খান যখন এই সিন্ডিকেটে হাত দিলেন, তখনই তিনি বিপদে পড়লেন। প্রথমে তাকে ভয় দেখানো হলো। তারপর তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ গেল, “উনি বেশি বাড়াবাড়ি করছেন, যাত্রী হয়রানি করছেন, এয়ারপোর্টের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন”। এরপর তাকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করা হলো। তার ফাইল আটকে দেওয়া হলো। তার অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় পুলিশ ফোর্স কমিয়ে দেওয়া হলো।
তার জরিমানা করা লোকদের ওপর থেকে ফোন আসতে শুরু করলো:
“ছেড়ে দেন, ও আমাদের লোক”।
একজন ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা সীমিত। তিনি জরিমানা করতে পারেন, কিন্তু চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে পারেন না। তিনি ১৫ দিন জেল দিতে পারেন, কিন্তু সিন্ডিকেটের গোড়া উপড়াতে পারেন না। এর জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ড. ইউনুসের সরকার প্রথম দিকে সেই সদিচ্ছা দেখিয়েছিল, কিন্তু এখন সেই সরকারও দুর্বল। নির্বাচনের আগে কেউ এয়ারপোর্টের সিন্ডিকেটের সাথে ঝামেলায় যেতে চায় না, কারণ এই সিন্ডিকেটের সাথে অনেক রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ আছে।
ফলে যা হওয়ার তাই হলো। নওশাদ খান এখনো আছেন, কিন্তু তাকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। তিনি এখন অফিসে বসে ফাইল সই করেন। আগের মতো টার্মিনালে ঘোরেন না। কারণ তিনি জানেন, ঘুরেও লাভ নেই, যাকে ধরবেন, উপর থেকে ফোন এসে ছেড়ে দিতে বলা হবে। এতে তার নিজের চাকরিই ঝুঁকিতে পড়বে।
গত মাসে কানাডা থেকে আসা এক প্রবাসী জানালেন, “আমি ঢাকা নেমে ওয়াশরুমে গেলাম, ক্লিনার ১০০ টাকা চাইলো। আমি বললাম, নওশাদ স্যার কোথায়? ক্লিনার হাসলো — ‘নওশাদ স্যার এখন ঠান্ডা হয়ে গেছে’।”
এই এক লাইনেই পুরো বাংলাদেশের চিত্র ফুটে ওঠে। এখানে ভালো মানুষ আসে, হিরো হয়, তারপর সিস্টেম তাকে ঠান্ডা করে দেয়।



