ঢাকা থেকে আবুধাবি পর্যন্ত আমার সহযাত্রী (৫৩/বি, ৫৩/সি) ছিলেন আমেরিকার মিশিগানে স্থায়ীভাবে বসবাসরত তরুণ মোঃ জসিম উদ্দিন, তাঁর বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুরে। অসুস্থ মা’কে নিয়ে তিনি শিকাগো হয়ে মিশিগান যাচ্ছেন। সিলেটের ভাষায় আমরা প্রাণখোলা কথা বললাম। জসিম বললেন তাঁদের বৃহত্তর পরিবারের সবাই মিশিগান থাকেন। ৫ঘন্টার জার্নির সময় বিশাল বিমানের পিছনের দিকে ছিল আমাদের সীট। ঢাকা – আবুধাবির ফ্লাইটে ভাত কারি দিয়ে রাতের খাবার সরবরাহ করে, সফট ড্রিংকস, জুস সরবরাহ করে। পেট ভর্তি থাকায় স্বাদ গ্রহণের জন্য কিছুটা নেই, খাবার শেষে জসিম আমাকে পান সুপারি খাব কিনা জিজ্ঞেস করল, মা’য়ের সাথে পানের বাটা আছে বলল। আবুধাবিতে নেমে আমরা দু’জন দুই রুটের বিমান ধরতে দৌড় শুরু করি। দু’ঘন্টার মধ্যে আমাদের দু’জনকে আমেরিকার বিমান ধরতে হবে। বিশাল আবুধাবির শেখ জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সব অত্যাধুনিক ব্যবস্থা। নানান চেকিং করে শত শত মানুষ ছুটছে, ইলেক্ট্রনিক্স বোর্ডের পাশাপাশি বিমানবন্দরের লোকজন যাত্রীদের সহায়তা করছে। আমেরিকার ইমিগ্রেশন আবুধাবিতে সম্পন্ন হলো। বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে কাঁচে ঘেরা স্মোকিং কক্ষে নারী পুরুষরা ঠাসাঠাসি করে ধুমপান করছে।
আবুধাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে নিউইয়র্ক কেন যাচ্ছি, কার বাসায় ওঠবো, কতদিন থাকব এসব প্রশ্ন করেন। ৪২ সি কাউন্টার দিয়ে বিমানে আরোহনের সময় মিশিগান থেকে মেসেঞ্জারে কল করেন ভাগ্নে মামুন খান। আবুধাবিতে মেসেঞ্জারে কথা বলা ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করা যায় না। মেসেঞ্জারে বার্তা দেয়া যায়, আমরা উভয়ে বার্তা বিনিময় করি। আবুধাবি পৌঁছার সংবাদ ও ভিডিও আমাদের বাসার গ্রুপে দিলে বাংলাদেশ সময় ভোর পাঁচটায় দুই মেয়ে (বুশরা ও সায়িমা) লাভ রিয়েক্ট দেয়।
আবুধাবি সময় ২ অক্টোবর ২০২৬ রাত ২.৩৫ শেখ জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিউইয়র্কের পথে ওড়াল দেয়। ঢাকা থেকে আবুধাবির টার্মিনাল A তে ইত্তেহাদ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট সিডিউল টাইমে ল্যান্ড করে। ১০ মিনিট হাটার দূরত্বে একই টার্মিনালের C42 কাউন্টারে নানান চেকিংর মধ্য দিয়ে মধ্যরাতে পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে আসা পায়ে হেঁটে চলন্ত রেমে যেতে হয়। বিশাল নান্দনিকভাবে নির্মিত শেখ জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের C এর সবকটি কাউন্টার আমেরিকার নানান রুটের যাত্রিদের জন্য, যেন এলাকাটি আমেরিকান কর্ণার। নিউইয়র্ক, শিকাগো, ওয়াশিংটন, ফ্লোরিডাসহ আমেরিকার বড় বড় শহরে ফ্লাইট যাচ্ছে। ঢাকা থেকে আমার সাথে আসা জসিম শিকাগো হয়ে ডমেস্টিক ফ্লাইটে মিশিগান যাবে।
আবুধাবি থেকে নিউইয়র্ক ৩৩ সি ছিল আমার সীট, ৩৩ এ ও বি ছিল ভারতের মুম্বাই থেকে আসা তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার জিত ও তার বোনের। উভয় রুটে করিডোরে পাশের সিট থাকায় আমার বাথরুমে যাওয়া আসাসহ পা ছড়িয়ে বসতে সহায়ক হয়েছে। আবুধাবি – নিউইয়র্ক রুটে খাবারের মেন্যু খুবই ভালো ছিল। টানা ১৪ ঘন্টার দীর্ঘ বিমান জার্নির বেশিরভাগ সময় ঘুমে কেটেছে। আরোহনের সাথে সাথে প্যাকেট করা গরমাগরম পিৎজা, ড্রিংকস, সকালে কয়েকপদের নাস্তা, দু ঘন্টা পর হেভি খাবার পরিবেশন করা হয়, ড্রিংকস, সফট ড্রিংকস, ফলের জুস ছিল সবসময়। ইউরোপ আমেরিকার রুটে সব বিমান ভালো খাবার সরবরাহ করে থাকে। ২০২২ সালের সফরে টার্কিশ এয়ারলাইন্সেও এশিয়া ইউরোপ রুটে খাবারের তারতম্য করতে দেখা গেছে। আমেরিকা যেতে সুবিশাল আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়া যেন এক বিশাল অভিজ্ঞতা।
ফ্লাইটরাডার২৪-এ উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে বিমানগুলোকে একমুখী যেতে হয়। এর প্রধান কারণ হলো নর্থ আটলান্টিক ট্র্যাকস (North Atlantic Tracks – NAT)। এটি মূলত আকাশের এক ধরণের অদৃশ্য মহাসড়ক। বায়ুমণ্ডলের উঁচুতে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাতাস প্রবাহিত হয়, যাকে জেটস্রিম বলে।
পূর্বমুখী ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে ইউরোপ (যেমন নিউ ইয়র্ক থেকে দোহা বা লন্ডন) যাওয়ার সময় বিমানগুলো এই বাতাসের সুবিধা নেয়। এতে বিমানের গতি বেড়ে যায় এবং জ্বালানি কম খরচ হয়। পশ্চিমমুখী ফ্লাইটে ইউরোপ থেকে আমেরিকা আসার সময় বিমানগুলো এই শক্তিশালী বাতাসের উল্টো দিকে আসতে চায় না, কারণ এতে সময় ও জ্বালানি দুই-ই বেশি লাগে। তাই তারা এই নির্দিষ্ট ট্র্যাকগুলো এড়িয়ে একটু ভিন্ন পথ (সাধারণত আরও উত্তরে বা দক্ষিণে) ব্যবহার করে।
আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর রাডার কভারেজ কম থাকায় নিরাপত্তার জন্য এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল একটি নির্দিষ্ট সময়ে সব বিমানকে একদিকে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
উত্তর আমেরিকা থেকে ইউরোপের দিকে যাওয়ার জন্য সময়টি নির্ধারিত থাকে। ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকার দিকে আসার জন্য তখন ট্র্যাকগুলো উল্টো করে দেওয়া হয়।
সময়ের পার্থক্য
যাত্রীদের চাহিদার কারণে বেশিরভাগ ফ্লাইট আমেরিকা থেকে রাতে ছেড়ে সকালে ইউরোপ পৌঁছাতে চায়। আবার ইউরোপ থেকে সকালে ছেড়ে বিকেলে আমেরিকা পৌঁছাতে চায়। এই বিশাল সংখ্যক বিমানের চাপ সামলাতে নির্দিষ্ট সময়ে আকাশপথকে একমুখী করে রাখা হয়। এটি কোনো স্থায়ী একমুখী রাস্তা নয়। বাতাসের গতিকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি বাঁচাতে এবং মাঝ-আকাশে সংঘর্ষ এড়াতে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বিমানগুলোকে এভাবে সারিবদ্ধভাবে চালানো হয়।
দীর্ঘ জার্নির পর অবশেষে যথাসময়ে নিউইয়র্ক সময় ২ অক্টোবর ২০২৬ সকাল সাড়ে আটটায় জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করে ইত্তেহাদ এয়ারলাইনস, স্থির হতে সময় নেয়। আমাদেরকে বলা হয় টার্মিনাল -৪ এর ডমেস্টিক ১০ বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহ করে নেয়ার জন্য। যাত্রীদের দীর্ঘ সারি পার হয়ে, উচু নিচু পথ মাড়িয়ে দশ নম্বর লাগেজ বেল্টে এসে মিনিট দশেকের মধ্যেই লাগেজ হাতে চলে আসে, কারো কোন জিজ্ঞেস নেই, কযেক কদম পা সামনে ফেলতেই ডমেস্টিক এক্সিট গেটের বাহিরে এসে এয়ারপোর্টের সামন দিয়ে যান চলাচল দেখে বুঝতে পারলাম আমি চলে এসেছি আমেরিকায়।
আমাকে রিসিভ করতে আসা চাচাতো ভাইয়ের ধারণা ছিল নিউইয়র্কে আমার ইমিগ্রেশন হবে, বের হতে কিছুটা বিলম্ব হবে। জেএফকের টার্মিনালে এজন্য আমাকে ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করতে হয়। ফ্রি ওয়াইফাই চালু থাকায় বাংলাদেশ ও আমেরিকার স্বজনদের সাথে মেসেঞ্জারে কথা বিনিময় হয়।
নিউজার্সির আগলাক আম্বিয়া চৌধুরী শায়েস্তা ভাই, আশরাফুল চৌধুরী ওয়েছ ভাই, নিউইয়র্কের শাহজাহান মামা, চালাতো ভাই তুহিনের সাথে কথা হয়। নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে উপস্থিতির ভিডিও তুলে বাসায় পাঠাই, ফেইসবুকে আপলোড দিয়ে আমার বন্ধুদের জানান দেই। আমেরিকার মাটিতে নির্বিঘ্নে প্রথম পা রেখে খুবই উৎফুল্ল লাগছে, দীর্ঘ ভ্রমণের কোন ক্লান্তি অনুভব হচ্ছে না। মহান আল্লাহপাকের দরবারে অশেষ কৃতজ্ঞতা তিনি তাঁর সৃষ্টিজগত দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। চাচাতো ভাই রাশেদ তাড়াহুড়ো করে এসে প্রথমেই কোলাকুলি করে, এয়ার ট্রেনে আমরা জ্যামাইকা স্টেশনে নেমে, দুই ট্রেন বদল করে ১৬৬-৪০, ৬৯ এভিনিউর বাসায় পৌঁছে যাই। এয়ার ট্রেন জেএফকে বিমানবন্দরের মাঝ দিয়ে গিয়ে বিমানবন্দরের অভ্যন্তর থেকে যাত্রিদের নিউইয়র্ক নগরীতে পৌঁছে দেয়। এটি পরিচালনা করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ভাড়া নেয় জনপ্রতি প্রায় ৯ ডলার। এয়ার ট্রেন থেকে নেমে লং আইল্যান্ড রেল চড়ে বাসায় ফিরি।
ট্রেনটিতে যেকোন গন্তব্যে যেতে ৩ ডলার পে করে স্টেশনে ঢুকতে হয়, বের হতে কিছু করা লাগেনা। রেলের কর্মকর্তা হওয়ায় চাচাতো ভাই রাশেদুজ্জামানকে কোন পে করতে হয়না, কার্ড ছোঁয়ালেই হয়। নিউইয়র্ক সিটির সবচেয়ে ব্যস্ত পরিবহন হলো এ কমিউটার রেল রোড। স্টেশনে যাত্রিদের অতি পুরনো আমলের কাঠের বেঞ্চ রয়েছে। রাশেদ জানালেন নিউইয়র্কের ছুটে চলা যাত্রিদের বসার সময় নেই, হোমলেস মানুষেরা অনেক সময় এখানে বসে।
ইউরোপের নানান দেশে মাসিক ও প্রতিদিনের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভাড়ার কার্ডে অবারিত মেট্রোরেল ও বাস চলার সুযোগ রয়েছে। রাশেদ আমাকে রেলওয়ে স্টেশনের মেশিন থেকে ‘OMNY’ কার্ড কিনে দেয়। ২০২২ সালে লন্ডনে বন্ধু সাংবাদিক আহমেদ শামীম লন্ডনে মেট্রোরেল চড়ার জন্য ‘OYSTER’ কার্ড করে দিয়েছিল, এবারের সফরে এটা নিয়ে এসেছি। নিউইয়র্কের বাসায় বাংলাদেশ থেকে বাবার কাজিন এসেছেন দেখে খুবই উৎফুল্ল ভাতিজি Amaara Zaman (11) ও ভাতিজা Abaan Zaman (6)



