নুন আনতে পান্তা ফুরানোর গল্পটা এখন আর শুধু নিম্নবিত্তের নয়, বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের নির্মম ও রূঢ় বাস্তবতা। উৎসবের আমেজ কিংবা মাসের শুরুর সেই চেনা আনন্দ এখন ঢাকা পড়েছে ক্রমাগত কাটছাঁটের নিদারুণ ব্যথায়। বাজারে গেলেই আজকাল মধ্যবিত্তের বুকটা কেঁপে ওঠে। যে হাতগুলো একসময় ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে সগর্বে বাড়ি ফিরত, সেই হাতগুলোই এখন পকেটের দিকে তাকিয়ে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে। সদাই কমিয়ে, সাধ আর সাধ্যের চরম টানাপোড়েনে পিষ্ট হয়ে কোনোমতে টিকে থাকার এক নীরব ও ক্লান্তিকর যুদ্ধ লড়ছে এই শ্রেণিটি।
কাগজে-কলমে বাজারের যে চিত্র উঠে আসছে, তা মধ্যবিত্তের রান্নাঘরের বাস্তবতার চেয়েও ভয়াবহ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো- এর সাম্প্রতিকতম প্রতিবেদন ও অর্থনৈতিক সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশে। অর্থাৎ, এক বছর আগের তুলনায় প্রতিটি সাধারণ পণ্যের পেছনে খরচ প্রায় এক-দশমাংশ বেড়েছে। সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে খাদ্যবহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি, যা বর্তমানে ৯.৩২ শতাংশের উচ্চ শিখরে অবস্থান করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের ওপর। খরচের তীব্র চাপে সাধারণ মানুষের জমানোর ক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে। বিবিএস-এর ‘জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান’ অনুযায়ী, জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার যেখানে ছিল ২৯.৯৫ শতাংশ, তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে নেমে এসেছে ২৬.৯৩ শতাংশে। ৩ শতাংশীয় পয়েন্টের এই পতন প্রমাণ করে মানুষ এখন জমানো সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। একইভাবে জিডিপির অনুপাতে দেশজ সঞ্চয়ের হারও ২৫.৭৬ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ২১.৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
মাছের বাজারে কিংবা মাংসের দোকানে এখন মধ্যবিত্তের আনাগোনা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। আগে যেখানে সপ্তাহে অন্তত একদিন টেবিলে ভালো খাবারের আয়োজন থাকত, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ডিম কিংবা আলুভর্তার মতো সাধারণ পদ। সন্তানের মুখে এক টুকরো পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে গিয়ে মা-বাবার কপালে যে চিন্তার গভীর ভাঁজ পড়ে, তা কোনো বাজারের তালিকায় লেখা থাকে না। এক কেজি চাল, আধা লিটার তেল আর গুটিকয়েক সবজি কিনতে গিয়েও মধ্যবিত্তকে এখন হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পছন্দমতো বড় মাছ বা মাংসের জায়গা নিয়েছে ছোট মাছ কিংবা ডিম-ডাল। প্রতি মাসের পুরো রেশনের সদাই না করে সপ্তাহে সপ্তাহে ভেঙে খুব সীমিত কেনাকাটা করছে মানুষ। এমনকি ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত পণ্য ছেড়ে মধ্যবিত্ত ঝুঁকছে খোলা বাজারের সাধারণ মানের পণ্যের দিকে।
মধ্যবিত্তের এই অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির দানব এবং বাজারের অদৃশ্য অসাধু সিন্ডিকেটের থাবা। সাধারণ মানুষের পকেট কেটে একদল অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও কিংবা দেশের উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও, এই সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে তার কোনো সুফল পায় না সাধারণ মানুষ। টাকার অবমূল্যায়ন আর উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই জাঁতাকলে পড়ে মধ্যবিত্তের আয়ের অঙ্কটা অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয়ের খাতগুলো হয়ে উঠেছে আকাশচুম্বী। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট না ভাঙলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—তারা না পারে ওএমএসের লাইনে দাঁড়িয়ে সস্তায় সাহায্য নিতে, না পারে কারও কাছে হাত পাততে। নিম্নবিত্তরা অন্তত মুখ ফুটে অভাবের কথা বলতে পারে, কিন্তু মধ্যবিত্তের রয়েছে এক অদৃশ্য আত্মসম্মানের দেয়াল। সেই দেয়াল আঁকড়ে ধরে তারা ঘরের কোণে নীরবে চোখের জল ফেলে। ছেঁড়া জুতোটা জোড়াতালি দিয়ে পরা, পরিবারের সামনে অভাব আড়াল করা, কিংবা সন্তানের স্কুলের ফি দিতে গিয়ে নিজের জরুরি চিকিৎসা ও ওষুধ কেনা বন্ধ করে দেওয়া—এই হলো এখনকার মধ্যবিত্ত জীবনের করুণ চালচিত্র।
ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য জমানো ডিপিএস বা সঞ্চয়পত্র ভেঙে এখন সংসার চালাতে হচ্ছে অনেককে। মাস শেষে বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল আর বাচ্চাদের স্কুলের খরচ মিটিয়ে মাসের অর্ধেকটা সময়ই পার করতে হচ্ছে ধারদেনা করে। মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেট শূন্য হয়ে যাওয়ার এই মানসিক চাপ প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে মধ্যবিত্তের সুখ-শান্তি। বাজারের এই অগ্নিমূল্য কেবল জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়নি, কেড়ে নিয়েছে একটা আস্ত শ্রেণির বেঁচে থাকার স্বাভাবিক অধিকার ও আনন্দ। সদাইয়ের তালিকা ছোট করতে করতে তারা আজ নিজেদের স্বপ্নগুলোকেও ছোট করে ফেলেছে। মুদ্রাস্ফীতির এই রাহুগ্রাস আর সিন্ডিকেটের খাঁচায় বন্দি মধ্যবিত্তের এই নীরব কান্না আর কতদিন বাজার অর্থনীতির আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকবে, সেই উত্তর আজও অজানা



