২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন

ব্রঙ্কসে এগিয়ে সেলিম-আলী, ব্রুকলিনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

ব্রঙ্কসে এগিয়ে সেলিম-আলী, ব্রুকলিনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন ঘিরে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা ও ভোটের হিসাব-নিকাশ। আগামী ২৫ অক্টোবর নগরীর পাঁচটি কেন্দ্রে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে এ নির্বাচন। কেন্দ্রগুলো হলো উডসাইড, জামাইকা, ব্রুকলিনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ডস, ওজন পার্ক ও ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার। এবারের নির্বাচনে সেলিম-আলী ও কুনু-ফিরোজ প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ ছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদে স্বতন্ত্রভাবে লড়ছেন রাব্বী সৈয়দ।

 

নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ। কোন কেন্দ্রে কোন প্যানেল এগিয়ে, আঞ্চলিক ভোটের সমীকরণ কী এবং ভোটের দিন সমর্থকদের কতটা কেন্দ্রে আনা যাবে—এসব বিষয়ই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সংশ্লিষ্ট ভোটার ও নির্বাচনী কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা এবং তাঁদের দেওয়া হিসাবের ভিত্তিতে ব্রঙ্কস ও ব্রুকলিন কেন্দ্রের নির্বাচনী পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো।

 

ব্রঙ্কসে সেলিম-আলী এগিয়ে, ব্যবধান নিয়ে চলছে হিসাব

ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারে প্রতিদিনই বসছে ভোটারদের আড্ডা। ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্ট, হাসান চাইনিজ, নিরব রেস্টুরেন্ট, মান্নান বেকারি কিংবা আল আকাসা—সবখানেই চলছে নির্বাচনী আলোচনা। ২৫ অক্টোবরের ভোটে শেষ পর্যন্ত কোন প্যানেল জিতবে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

 

সাধারণ ভোটারদের অনেকের ধারণা, এবার কোনো একটি প্যানেল সব পদে এককভাবে নিরঙ্কুশ জয় নাও পেতে পারে। কিছু পদে দুই প্যানেলের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত ফলাফল নির্ভর করবে ভোটের দিন কোন প্যানেল তাদের সমর্থকদের বেশি সংখ্যায় কেন্দ্রে আনতে পারে, তার ওপর। প্রাথমিক হিসাব-নিকাশে ব্রঙ্কসে সেলিম-আলী প্যানেল এগিয়ে থাকলেও জয়ের ব্যবধান কত হবে, তা নিয়ে রয়েছে নানা মত।

 

ব্রঙ্কস কেন্দ্রে মোট ভোটার প্রায় সাত হাজার। সেলিম-আলী প্যানেলের অনুসারীদের দাবি, তাঁরা প্রায় পাঁচ হাজার ভোট সংগ্রহ করেছেন। সেই হিসাব ধরে তাঁদের ধারণা, কুনু-ফিরোজ প্যানেলের ভোট প্রায় দুই হাজার। তবে পার্কচেস্টারের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচারণা পর্যবেক্ষণ করলে দুই পক্ষের তৎপরতা প্রায় সমান্তরাল দেখা যায়। ফলে শুধু ভোট সংগ্রহের দাবি দিয়ে মাঠের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা কঠিন।

 

নির্বাচনী সমীকরণে এবার বড় পরিবর্তন এসেছে সিলেটি ভোটারদের মধ্যে। সিলেট অঞ্চলের দুই নেতা সেলিম ও আজমল হোসেন কুনু এবার সভাপতি পদে মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অথচ গত নির্বাচনে কুনু ছিলেন সেলিম-আলী প্যানেলের পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান। দুজনের ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব নিয়েও ভোটারদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। একসময় একই পক্ষে কাজ করা দুই নেতার এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সিলেটি ভোটারদের একটি অংশ বিব্রত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

ব্রঙ্কসে সেলিম-আলী প্যানেলের পক্ষে কাজ করছেন মাহবুব আলম, রেজা আব্দুল্লাহ, আব্দুল হাসিব হাসনু, শামীম আহমেদ, রবিউজ্জামান, মমিনুল ইসলাম, আব্দুর রব ধলা মিয়া, লোকমান হোসেন লুকু ও রোকন হাকিমসহ অনেকে।

 

অন্যদিকে কুনু-ফিরোজ প্যানেলের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন জগলুল আহমেদ চৌধুরী, সোলায়মান ইসলাম, গোল্ডেন প্যালেসের মালিক বেলাল হোসেন, জামিল আনসারি, গউস উদ্দীন, জাকির চৌধুরী সিপিএ, সোলায়মান ভূঁইয়া ও মাইন উদ্দিন নটুসহ অনেকে। গোল্ডেন প্যালেসের বেজমেন্টে কুনু-ফিরোজ প্যানেলের নির্বাচনী কার্যালয়ও উদ্বোধন করা হয়েছে।

 

কুনু-ফিরোজ প্যানেলের সমন্বয়ক সোলায়মান ইসলাম ভোট সংগ্রহের হিসাবে তাঁদের পিছিয়ে থাকার কথা স্বীকার করলেও চূড়ান্ত ফল নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘গতবারের ভোটার তালিকা দেখে গনহারে সেলিম ভাইরা ভোট বানিয়েছে। এর অনেক ভোটই তাদের ট্রাকে নেই। হদিসও নেই। তারা বেশি ভোট বানানোর দাবি করলেও বাস্তবে তত নয়।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভোট করেছি গুনে গুনে। প্রত্যেকের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। আমাদের ভোটারদের কেন্দ্রে নিতে পারলেই ফলাফল পাল্টে যাবে। মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়। তা দেখার জন্যই তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন। কে ভোট বানালো, তা অনেকাংশেই কাজ করবে না।’

 

অন্যদিকে সেলিম-আলী প্যানেলের পরিচালনা কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা রোকন হাকিম বলেন, গত নির্বাচনে ব্রঙ্কসে তাঁদের প্যানেল ১ হাজার ২০০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল। এবারও একই ধরনের ব্যবধানে জয়ের আশা করছেন তাঁরা।

 

রোকন হাকিম বলেন, ‘সেলিম-আলী প্যানেল ভোট সংখ্যার বিবেচনায় ব্রঙ্কসে অনেক এগিয়ে আছে। ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি কমিউনিটির অধিকাংশ মানুষই সেলিম-আলীকে বেছে নেবেন বলে আমার বিশ্বাস।’

 

ব্রুকলিনে ফিরোজের নিজ এলাকায় সেলিম-আলীর কৌশল

কুনু-ফিরোজ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ফিরোজ আহমেদের নিজ এলাকা ব্রুকলিন। গত নির্বাচনে রুহুল-মিন্টু প্যানেলের কাছে এ কেন্দ্রে বড় ব্যবধানে হেরেছিল সেলিম-আলী প্যানেল। সে সময় সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী জাহিদ মিন্টু ছিলেন বড় ফ্যাক্টর। নোয়াখালীর সন্তান মিন্টুর সমর্থকদের প্রভাব ব্রুকলিনের ভোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

 

এবার সেলিম-আলীর প্রতিপক্ষ প্যানেলে জাহিদ মিন্টু না থাকায় ব্রুকলিনে ভালো ফলের আশা করছেন সেলিম-আলীর সমর্থকেরা। তবে ফিরোজ আহমেদ দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে এ এলাকায় বসবাস করছেন। সন্দ্বীপের বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসও ব্রুকলিনে। সন্দ্বীপ সোসাইটির সভাপতি হিসেবে ফিরোজের নিজস্ব আঞ্চলিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে আঞ্চলিক ভোটের সমীকরণে তাঁকে এগিয়ে রাখছেন তাঁর সমর্থকেরা।

 

ব্রুকলিন কেন্দ্রে মোট ভোটার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, ফিরোজ আহমেদ এককভাবে প্রায় আড়াই হাজার ভোট সংগ্রহ করেছেন। তবে তাঁর সব ভোট ব্রুকলিন কেন্দ্রে নয়; সাত শতাধিক ভোট বিভিন্ন কেন্দ্রে ছড়িয়ে রয়েছে। তাই নিজের এলাকায় তাঁর ভোটের প্রকৃত প্রভাব কতটা থাকবে, তা নিয়ে রয়েছে হিসাব-নিকাশ।

 

ব্রুকলিনের ভোটের বড় অংশ নোয়াখালী, সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভোটারদের ওপর নির্ভর করছে। এ তিন অঞ্চলের ভোটারদের অবস্থানই দুই প্যানেলের জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

নোয়াখালীর ভোট দুই ভাগে

ব্রুকলিনে নোয়াখালীর ভোটাররা এবার দুই ভাগে বিভক্ত। রব মিয়া কাজ করছেন কুনু-ফিরোজের পক্ষে। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সৈয়দ আজাদ, মির্জা হোসেন, জাকির এইচ চৌধুরী, মফিজুর রহমান ও রহমত উল্লাহসহ অনেকে।

 

অন্যদিকে নোয়াখালী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাঈনুদ্দিন পিন্টু, নাজমুল হাসান মানিক, তাজুল ইসলাম ও খোকন মোশাররফ রয়েছেন সেলিম-আলী পরিষদের সঙ্গে। নোয়াখালী সমিতির সভাপতি জাহিদ মিন্টু কোনো পক্ষকেই প্রকাশ্যে সমর্থন জানাননি। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, নোয়াখালী অঞ্চলের ভোট প্রায় দেড় হাজার।

 

সেলিম-আলী প্যানেল থেকে নোয়াখালীর পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন হারুন চেয়ারম্যান, এএসএম মঈন উদ্দীন বাবলু, জাহাঙ্গীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আব্দুল মান্নান ও আব্দুল মালেক খান।

 

নোয়াখালীর আরেকটি গ্রুপও সরাসরি সেলিম-আলী প্যানেলের পক্ষে কাজ করছে। এ অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নাঈম টুটুল, হারুন চেয়ারম্যান ও জাহাঙ্গীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁদের দাবি, তাঁরা এক হাজারের বেশি ভোট সংগ্রহ করেছেন। তবে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হওয়ায় টুটুল সরাসরি নির্বাচনী মাঠে কাজ করতে পারছেন না।

 

এ পরিস্থিতিতে নোয়াখালীর ভোটে সেলিম-আলী প্যানেল সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে কুনু-ফিরোজ প্যানেলের সমর্থকেরা নোয়াখালী সমিতির সঙ্গে কবর কেনা নিয়ে সেলিম-আলী পক্ষের পুরোনো দ্বন্দ্বকে কাজে লাগাতে চাইছেন।

 

নোয়াখালী থেকে কুনু-ফিরোজ প্যানেলের হয়ে নির্বাচন করছেন মঈন উদ্দীন নুটু ও মোরশেদ আলম। নুটু ব্রঙ্কসে এবং মোরশেদ ওজন পার্কে বসবাস করেন।

 

সন্দ্বীপের ভোটে ফিরোজের প্রত্যাশা

 

আঞ্চলিক ভোটের হিসাবে সন্দ্বীপের ভোট ফিরোজ আহমেদের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সন্দ্বীপ সোসাইটির নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কারণে নিজ এলাকার ভোটেও বিভাজন দেখা দিয়েছে।

 

ফিরোজের বিরোধী হিসেবে পরিচিত একটি অংশ তাঁর বিপক্ষে কাজ করছে। এ অংশে রয়েছেন আজহারুল হক, ইকবাল হোসেন, মিয়া কাদের, হেলাল উদ্দীন, আব্দুল হান্নান পান্না ও এমলাক হোসেন ফয়সল। ফলে সন্দ্বীপের ভোটে আঞ্চলিক সমর্থনের সুবিধা ফিরোজ কতটা কাজে লাগাতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

 

চট্টগ্রাম সমিতির ভোটেও বিভক্তি

ব্রুকলিনের নির্বাচনী সমীকরণে চট্টগ্রাম সমিতির নেতাকর্মীদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। এ সমিতির নেতারা দুই প্যানেলের পক্ষে বিভক্ত হয়ে কাজ করছেন।

 

কাজি আজম, মোহাম্মদ হানিফ, আবু তাহের ও মনির হোসেনসহ অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা কুনু-ফিরোজ প্যানেলের দিকে রয়েছেন। তবে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হওয়ায় কাজি আজম প্রকাশ্যে অবস্থান জানাতে পারছেন না।

 

অন্যদিকে মাকসুদ এইচ চৌধুরী, মাসুদ সিরাজী, মোক্তাদির বিল্লাহ, আইয়ুব আনসারী, আলী আকবার বাপ্পী, আহসান হাবিব, মোহাম্মদ নুরু ও ইকবাল হোসেনসহ অনেকে সেলিম-আলী প্যানেলের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের নেতৃত্বাধীন চট্টগ্রাম সমিতির অনেক সদস্যও এ প্যানেলের সঙ্গে রয়েছেন। তবে তাহের-আরিফের নেতৃত্বাধীন অনেক নেতা কুনু-ফিরোজকে সমর্থন দিচ্ছেন।

 

সেলিম-আলী প্যানেলের পক্ষে থাকা মাকসুদ এইচ চৌধুরী বলেন, ‘ব্রুকলিন কেন্দ্রে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। জয়ের সম্ভাবনা আমাদের বেশি।’

 

তবে কুনু-ফিরোজের সমর্থকেরা এ হিসাব মানতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, নিজ এলাকার প্রার্থীদের প্রতি ভোটারদের সমর্থন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেই বিবেচনায় ব্রুকলিনে তাঁরাই জয়ী হবেন বলে আশা করছেন তাঁরা।

 

কাজি আজম বলেন, ‘আমি একটি প্যানেলকে সমর্থন করলেও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হওয়ায় মুখ খুলতে পারছি না।’

 

আগামী ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে ব্রঙ্কসে সেলিম-আলী প্যানেলের ভোট সংগ্রহের দাবি এবং ব্রুকলিনে কুনু-ফিরোজের আঞ্চলিক প্রভাব—দুই কেন্দ্রেই তৈরি করেছে ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণ। শেষ পর্যন্ত ভোটের দিন সমর্থকদের উপস্থিতি, আঞ্চলিক ভোটের বিভাজন এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ কোন প্যানেলকে কতটা সুবিধা দেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ফলাফল।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৩৩
  • ১১:৪৪
  • ৩:৫৬
  • ৫:৩৮
  • ৬:৫১
  • ৫:৪৫