ছবি: সংগৃহীত

নিজাম উদ্দীন সালেহ

নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে একটি মোটরসাইকেলে করে কাজ থেকে ফিরছিলেন ২৬ বছরের শাহ আদরি। সদ্য সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি পেয়েছেন। ১১ দিন পর তার ছোট ভাই ১০ বছরের শাহ ওয়াদি জ্বরে মারা গেল। হবিগঞ্জের ফুলবাড়ির একটি পরিবার ৩০ বছর ধরে আমেরিকায় থেকে যে স্বপ্ন বুনেছিল, তা শেষ হলো একটি সড়কের মোড়ে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর খবর খুললেই দেখা যায় সড়ক দুর্ঘটনা।

গত ২ দিন আগেও নিউইয়র্কে বাবা-ছেলেকে পিষে দিলো পুলিশের ধাওয়া খাওয়া গাড়ি। মিশিগানে নূর মিয়া সবে ভিজিটর ভিসায় ছেলের কাছে এসেছিলেন, ছেলের গাড়িতেই দুজন পিষ্ট হয়ে মারা গেলেন। মেরিল্যান্ডে মাতাল ড্রাইভার উল্টো পথে এসে কেড়ে নিল বরগুনার শামীমা বেগম ও তার মেয়ে আরিবাকে। জ্যাকসন হাইটসে রাস্তা পার হতে গিয়ে ট্রাকের নিচে চলে গেলেন সিলেটের গোলাপগঞ্জের নিশাত জান্নাত, সিটি কলেজের ১৯ বছরের মেধাবী ছাত্রী।
আমেরিকায় আমাদের বেশিরভাগ তরুণ কাজ করেন উবার, লিফট, ডেলিভারি, রেস্টুরেন্টে। দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা গাড়ি চালানো, রাত জেগে ডেলিভারি, ক্লান্ত শরীরে স্টিয়ারিং ধরা মানেই মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো। শাহ আদরি কাজ থেকে ফিরছিলেন, নিশাত কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন।

বাংলাদেশে আমরা যেভাবে রাস্তা পার হই, আমেরিকায় সেটা আত্মহত্যার শামিল। জে-ওয়াকিং, হেলমেট ছাড়া বাইক, পুরোনো গাড়ি, আমাদের কমিউনিটিতে সচেতনতার ভয়াবহ অভাব।
একটি মৃত্যু হলে আমরা জানাজা পড়ি, ফেসবুকে ইন্না লিল্লাহ লিখি, টাকা তুলে লাশ দেশে পাঠাই। তারপর ভুলে যাই। কখনো কি কমিউনিটি সংগঠনগুলো ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, নতুন অভিবাসীদের জন্য রোড সেফটি ওয়ার্কশপ করেছে? করেনি।
আমেরিকায় টিকে থাকার লড়াই এতটাই কঠিন যে, অনেকে জীবনের নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করেন। একটি ভালো গাড়ি কেনার টাকা নেই, তাই ৩০০০ ডলারের পুরোনো গাড়িতে জীবন নিয়ে ছুটেন। ইন্স্যুরেন্স বাঁচাতে ফুল কভারেজ নেন না।
সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ব্যাপার হলো, এই মৃত্যুগুলো নীরব। আমেরিকান মিডিয়ায় এগুলো দুই লাইনের খবর। বাংলাদেশের মিডিয়াতে কোনটা আসে, কোনটা আসে না। শুধু সিলেট, নোয়াখালী বা বরগুনার একটি গ্রামে একটি মা আজীবন অপেক্ষা করে থাকে, যে ছেলে বলেছিল, “মা, পরের বছর তোমাকে নিউইয়র্ক নিয়ে আসব”- সে আর ফেরে না।

আমেরিকান ড্রিমের মহাসড়কটি আমাদের জন্য দিন দিন মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠছে। শুধু জানাজা পড়লে হবে না, এখন কথা বলতে হবে। আমাদের সংগঠনগুলোকে, মসজিদগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। নইলে প্রতিদিন সকালে আমরা আরো একটি শাহ আদরি, আরো একটি নিশাতের মৃত্যু সংবাদ পাব।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন হাঁটা সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজগুলোর একটি।
এর মধ্যে ৭৫% মৃত্যুই ঘটে রাতের অন্ধকারে, আর ৫০% এর বেশি ঘটে এস ইউভি এবং বড় ট্রাকের ধাক্কায়।
এই জাতীয় সংকটের ভেতর বাংলাদেশি কমিউনিটি একটি বড়ো ঝুঁকিতে। ২০২৬ অক্টোবর নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে মোটরসাইকেলে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে শাহ আদরি (২৬) নিহত হন। ২০২৬ সেপ্টেম্বর মেরিল্যান্ডের একটি হাইওয়েতে উল্টো পথে আসা মাতাল ড্রাইভারের ধাক্কায় শামীমা বেগম (৪৬) ও মেয়ে আরিবা (২৩) নিহত হন।
২০২৪ অক্টোবর মিশিগানের হ্যামট্রামেকে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে পুলিশের ধাওয়া খাওয়া গাড়ির ধাক্কায় বাবা নূর মিয়া (৬৫) ও ছেলে মাহিদুল ইসলাম সুজন (৩৫) নিহত হন। ২০২৪-২০২৬ সালে নিউইয়র্কে সিটি কলেজের ছাত্রী নিশাত জান্নাত (১৯), কুইন্সে রাস্তা পার হতে গিয়ে গোলাপগঞ্জের এক তরুণীসহ অন্তত ৭ জন বাংলাদেশি পথচারী নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগের বাড়ি সিলেট, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে।

শুধু নিউইয়র্ক শহরেই ২০২৩ সালে ৭৬৬ জন পথচারী মারা গেছেন, যার একটি বড় অংশ অভিবাসী অধ্যুষিত কুইন্স, ব্রঙ্কস ও ব্রুকলিনে। আমাদের কমিউনিটির হিসাবে, প্রতি বছর গড়ে ১২-১৫ জন বাংলাদেশি শুধু নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি ও মিশিগানেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন, যার ৬০% এর বেশি পথচারী বা বাইক আরোহী।
অনেকে মনে করেন, আমেরিকার রাস্তা মানে নিরাপদ রাস্তা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমেরিকার রাস্তা এখন বাংলাদেশের চেয়েও বেশি বেপরোয়া। সেখানে গাড়ি বড়, গতি বেশি, আর আমাদের মতো নতুন অভিবাসীদের জন্য কোনো ফুটওভার ব্রিজ নেই, কোনো সচেতনতা নেই।

এই মৃত্যুগুলোকে শুধু ‘দুর্ঘটনা’ বলে চালিয়ে দিলে হবে না। এটি একটি সামাজিক ব্যর্থতা। আমরা আমাদের ভাইকে আমেরিকা পাঠাই, কিন্তু শেখাই না কীভাবে জেব্রা ক্রসিংয়ে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে রাতে রিফ্লেক্টিভ জ্যাকেট পরতে হয়, কীভাবে ৩০০০ ডলারের পুরোনো গাড়িটি কেনার আগে ব্রেক চেক করতে হয়।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *