এক বছর আগে ১১ ভোটে পরাজয়, এবার ১২ ভোটে এগিয়ে। সিলেটের গোলাপগঞ্জের সন্তান মুহিত মাহমুদ মিশিগানের হামট্র্যামক শহরের মেয়র নির্বাচনে জয়ী হলে হবেন শহরটির প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান মেয়র। তবে ভোট গণনা হলেও আইনি জটিলতায় চূড়ান্ত ফল এখনো অনিশ্চিত।

সিলেটের গোলাপগঞ্জ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হামট্র্যামক। প্রবাসজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন মুহিত মাহমুদ। এবার শহরটির মেয়র পদ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি। ২০২৫ সালের নির্বাচনে মাত্র ১১ ভোটে পিছিয়ে থাকা এই বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রার্থী এবার ৩৭টি বিতর্কিত ডাকভোট গণনার পর ১২ ভোটে এগিয়ে গেছেন। চূড়ান্ত ফল তাঁর পক্ষে গেলে হামট্র্যামকের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান মেয়র হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

গত ১৬ অক্টোবর গণনা করা হয় আগে অগণিত থাকা ৩৭টি ডাকভোট। গণনা শেষে মুহিত মাহমুদের ভোট দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৯, আর বর্তমান মেয়র আদম আলহারবির ভোট ২ হাজার ৭৭। অর্থাৎ নতুন হিসাব অনুযায়ী, মাহমুদ ১২ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন।

গণনা করা ৩৭টি ভোটের মধ্যে ২৯টি পড়েছে মাহমুদের পক্ষে এবং ছয়টি আলহারবির পক্ষে। বাকি দুটি ভোটের হিসাব অন্যান্য প্রার্থী বা গণনাসংক্রান্ত শ্রেণিতে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ভোটের এই হিসাব এখনো চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল নয়। আদালতের নির্দেশনা ও চলমান মামলার কারণে ফল প্রত্যয়ন প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে। ফলে ভোটের হিসাবে এগিয়ে গেলেও মেয়রের দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

৩৭টি ডাকভোট ঘিরে আইনি লড়াই

২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হামট্র্যামকের মেয়র নির্বাচনে ভোট গণনার পর আদম আলহারবিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু নির্বাচনের পর ৩৭টি ডাকভোটের খাম অগণিত থেকে যায়। পরদিন সেগুলো নগর কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ভোটগুলো কেন গণনা করা হয়নি, সেগুলোর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং সেগুলো গণনার আইনগত সুযোগ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে শুরু হয় আইনি বিরোধ।

প্রথমদিকে ভোটগুলো গণনার বাইরে রাখা হলেও মুহিত মাহমুদ বিষয়টি আদালতে নিয়ে যান। নিম্ন আদালতে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়লেও গত মার্চে মিশিগান আপিল আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেয়। আদালতের নির্দেশনার মূল বক্তব্য ছিল, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ভুলের কারণে ভোট গণনা অসম্পূর্ণ থাকলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে।

এরপর কাউন্টি সার্কিট আদালত ১৬ অক্টোবরের মধ্যে ওই ৩৭টি ভোট গণনার নির্দেশ দেয়। নির্ধারিত দিনেই ভোট গণনা সম্পন্ন হওয়ার পর বদলে যায় নির্বাচনের হিসাব।

ভোটের বৈধতা নিয়ে আপত্তি

ভোট গণনা সম্পন্ন হলেও বিরোধের অবসান ঘটেনি। বর্তমান মেয়র আদম আলহারবির আইনজীবী নাবিহ আয়াদ ভোটপত্রের হেফাজত ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভোটপত্রগুলো কোথায় এবং কীভাবে সংরক্ষিত ছিল, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এই আপত্তির নিষ্পত্তি এবং ভোটের আইনগত বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নতুন হিসাবের ভিত্তিতে নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ ৩৭টি ভোট গণনার মাধ্যমে ফলের ব্যবধান বদলালেও নির্বাচনী বিরোধের আইনি অধ্যায় এখনো শেষ হয়নি।

বসবাসের যোগ্যতা নিয়েও মামলা

মুহিত মাহমুদের মেয়র পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে আরেকটি আইনি বিরোধ রয়েছে। আলহারবি পক্ষের দাবি, মাহমুদ প্রকৃতপক্ষে হামট্র্যামক শহরের বাসিন্দা নন। তবে মাহমুদ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, হামট্র্যামকই তাঁর বাসস্থান।

মাহমুদের পরিবারের সদস্যরা পাশের ট্রয় শহরে বসবাস করেন—বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে বসবাসের যোগ্যতা নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পক্ষের বক্তব্যকেই চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

ওয়েন কাউন্টির বোর্ড জানিয়েছে, বসবাসসংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন থাকায় নতুন ভোটের ফল এখনই প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে ২২ অক্টোবর আদালতে শুনানির কথা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গোলাপগঞ্জ থেকে হামট্র্যামকের রাজনীতি

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার সন্তান মুহিত মাহমুদের প্রবাসজীবন শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শ্রমিক সংগঠন ইউনাইট হিয়ার লোকাল ২৪-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির স্থানীয় রাজনীতিতেও ভূমিকা রেখেছেন।

২০২১ সালের নগর পরিষদ নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। পরে ২০২২ সালে একটি শূন্য পদে তাঁকে নগর পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচনের প্রাথমিক পর্বও অতিক্রম করেন তিনি।

দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতায় মেয়র নির্বাচন তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় হয়ে উঠেছে। তবে শেষ পর্যন্ত মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করছে নির্বাচনী ফলের প্রত্যয়ন এবং চলমান আইনি বিরোধের নিষ্পত্তির ওপর।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নজর এখন হামট্র্যামকে

হামট্র্যামকের মেয়র নির্বাচন এখন স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন প্রার্থীর যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহরের মেয়র হওয়ার সম্ভাবনা প্রবাসী সমাজে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে।

মুহিত মাহমুদ নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করলে হামট্র্যামকের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান মেয়র হওয়ার পরিচয় অর্জন করবেন। তবে সম্ভাব্য এই অর্জনের আগে তাঁকে পেরোতে হবে আইনি জটিলতার শেষ ধাপ।

এক বছর আগে মাত্র ১১ ভোটের ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা মুহিত মাহমুদ এবার ৩৭টি ডাকভোট গণনার পর ১২ ভোটে এগিয়ে। নির্বাচনী অঙ্ক বদলেছে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো বাকি। হামট্র্যামকের মেয়রের আসনে শেষ পর্যন্ত কে থাকবেন, তা নির্ধারণে এখন আদালতের সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *