এমদাদ চৌধুরী দীপু : ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন ঢাকার সিটি এসবিতে (নগর স্পেশাল ব্রাঞ্চ) কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রফিকুল ইসলাম শিমুল। তাঁর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দী গ্রামে। তিনি সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। বেনজীরের মতো ঠিক একই কায়দায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংখ্যালঘু ও দুর্বলদের ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে শত শত বিঘা জমি, শহরে-গ্রামে বিলাসবহুল বাড়ি, মাছের খামার—সবই করেছেন।
চাকরির সুবাদে হয়ে উঠেছেন অন্যতম বিত্তশালী। এ যেন পুলিশ বাহিনীতে আরেক ‘বেনজীর’। রফিকুল ইসলাম অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজের ও স্ত্রীর পাশাপাশি ভাই-বোন, ভাই-বোনের ছেলেমেয়ে, শ্যালক, শ্যালকের স্ত্রী, শ্যালিকা, শ্যালিকার স্বামীসহ বিভিন্নজনের নামে অঢেল সম্পদ গড়েছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন করে তিনি নিজেও বিপদে পড়েছেন, পাশাপাশি অবৈধ সম্পদের অংশীদার বানিয়ে আত্মীয়-স্বজনকেও বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। এসব সম্পদের তথ্য পাওয়া মাত্র জব্ধ করার অনুমতি চেয়েছে দুদক।
রফিকুল ইসলামের যেসব সম্পদ জব্দের অনুমতি চাওয়া হয়েছে সেগুলো হলো : গোপালগঞ্জ সদরে রফিকুল ইসলামের নিজ নামে থাকা ৪৯ শতাংশ জমি, মিরপুরের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের ১০ শতাংশ জমি, নিকুঞ্জে পাঁচ কাঠার প্লট, গোপালগঞ্জ সদরে আরো ৬৭ শতাংশ জমি, ফার্মগেটের চারতলা ভবন, শ্বশুরের নামে রাজধানীর নাখালপাড়ায় পাঁচতলা ও ছয়তলা দুটি ভবন, ভাইদের নামে প্রায় ১০ একর জমি, গোপালগঞ্জের কানাডা সুপার মার্কেট, রফিকুল ইসলামের ভাই আমিনুলের কাকরাইলের ফ্ল্যাট, আরেক ভাই দিদারুলের নামে মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট, ভাতিজি উর্মীর নামে ধানমণ্ডির ফ্ল্যাট, রফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত দলিল লেখক উজ্জ্বল মামুন চৌধুরীর নামে কয়েক একর জমি, ভাতিজির স্বামীর নামে একটি বাড়ি, রফিকুলের স্ত্রীর নামে একটি জাহাজ, রফিকুলের শ্বশুরের নামে তিনটি জাহাজ এবং আরেক ভাই মনিরুলের ব্যবহৃত একটি জিপ।
রফিকুল ইসলাম তাঁর বাবার মৃত্যুর পর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে চাকরিতে যোগদান করেন এবং সরকারি জমিও গ্রহণ করেন। এদিকে তাঁর বাবা কখনো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি বলে গোপালগঞ্জের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জানা যায়।
রফিকুল ইসলাম ১০ বছরের বেশি সময় ফার্মগেটের (৮২/২ ইন্দিরা রোড) বাসায় বসবাস করছেন। বহুতল ফাউন্ডেশনের চারতলা ভবন এবং এর বিলাসবহুল আসবাব, যার আনুমানিক মূল্য ৫৬ কোটি টাকার বেশি। এই বাড়ির সব ফ্ল্যাটের ভাড়া রফিকুলের স্ত্রী ফারজানা রহমান সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া মিরপুর চিড়িয়াখানার পাশে ১২ কোটি ১৯ লাখ টাকায় প্রায় দুই বিঘা জমি কেনেন রফিকুল ইসলাম। সেখানে টিনশেড বিল্ডিং করে ৬৩টি রুম ভাড়া দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুর চিড়িয়াখানা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স এলাকার ৫ নম্বর রোডের ৪৫ নম্বর প্লটের প্রকৃত মালিক বীর মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী। তাঁকে ভয় দেখিয়ে নামমাত্র মূলে জমিটি কিনে নেন রফিকুল ইসলাম শিমুল ও তাঁর সহকর্মীরা।
রফিকুল ইসলাম পুলিশে যোগ দেওয়ার আগে ৬ নম্বর পাইককান্দী ইউনিয়নের ২৯ নম্বর পাইককান্দী মৌজায় বিআরএস দাগ নম্বর ৪৭-এর ওপর ছোট একটি টিনের ঘর ছিল, যা এখনো বিদ্যমান। তিনি পুলিশে যোগ দেওয়ার পর একই ইউনিয়নের ২৭ নম্বর বিজয়পাশা মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানে ইজারা নেন বিআরএস দাগ নম্বর ৫৬৯, যে জমির পরিমাণ ১.০৭ একর, যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে তিন বছরের জন্য শিডিউলের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়। রফিকুল ইসলাম তাঁর ভাইদের এবং ভাগ্নিজামাই সেলিম মীরের নামে তিন বছরের জন্য ওই জমি ইজারা নেন। বিআরএস দাগ নম্বর ৫৬৯ পুকুরটি খাসপুকুর হওয়ার পরও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু ভরাট করে দখল করেন। এ ছাড়া এই বাড়ির সীমানার মধ্যে পাশের মালিক আসমা বেগমের প্রায় তিন কাঠা জমি জবরদখল করে নিজের বাড়ির সীমানাভুক্ত করে নেন। এভাবে মোট প্রায় ১.৫৬ একর জমির ওপর বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়িসহ বাংলো বাড়ি নির্মাণ করেন।
রফিকুল ইসলাম গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ২৭ নম্বর বিজয়পাশা মৌজা বিআরএস দাগ নম্বর ৩২৬, বিজয়পাশা বাসস্ট্যান্ডের জমি তাঁর পাঁচ নম্বর ভাই মাহফুজুর রহমানের নামে মাহাতাব চৌধুরীর কাছ থেকে এক কোটি ৫৫ লাখ টাকায় কেনেন। মাহাতাব চৌধুরীর কাগজপত্র ভুল থাকায় পুনরায় এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা দিয়ে ২০২২ সালে সোহেল চৌধুরী এবং ২০২৩ সালে নিজাম চৌধুরীর কাছ থেকে কেনেন। ক্রয় করা বিআরএস ৩২৬ নম্বর দাগের পূর্ব দিকে বিশ্বরোডসংলগ্ন সরকারি জায়গা দখল করে সেখানে বহুতল ফাউন্ডেশনে একটি মার্কেট নির্মাণ করেছেন। মার্কেটের নাম ‘কানাডা সুপার মার্কেট’।
রফিকুলের স্ত্রী ফারজানা রহমানের নামে ৪৯ শতাংশ জমি রয়েছে পাইককান্দী ইউনিয়নের আমুড়িয়া মৌজায়, যার বিআরএস দাগ নম্বর ৩৫৫। জমিটি ২০১৫-১৬ সালে গোপালগঞ্জ সদর রেজিস্ট্রার অফিসে দুটি দলিলের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করা হয়। জমিটির মূল্য ৯৮ লাখ টাকা। গোপালগঞ্জ সদর সাবরেজিস্ট্রার অফিস দলিল নম্বর ১৪৩/২০ মূলে রফিকুল ইসলাম তাঁর পাঁচ নম্বর ভাই মাহফুজুর রহমানের নামে জমি এক কোটি ৫০ লাখ টাকায় কেনেন।
২০২২ সালে গুলশানের ঢাকা ইউনাইডেট হাসপাতালের পাশে ছয় হাজার স্কয়ার ফিটের একটি ফ্লোর ১৪ কোটি ৫৫ টাকায় স্ত্রী ফারজানা রহমানের নামে কেনেন রফিকুল। ২০১৯ সালে ঢাকায় রাজউকের ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে দুটি প্লট ১০ কোটি টাকায় স্ত্রী ফারজানা রহমানের নামে কেনা হয়। এ ছাড়া রফিকুল ইসলামের মেজো বোনের স্বামী শাখায়েত হোসেন মোল্লার নামে এক কোটি ৫৫ লাখ টাকায় জায়গাসহ একটি বাড়ি কেনেন। ভাগ্নিজামাই সেলিম মীরকে ২৭ নম্বর বিজয়পাশা মৌজায় বিআরএস নম্বর ১১১৫ জমিটিতে তিনতলা ফাউন্ডেশন করে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে একতলা ভবন করে দিয়েছেন।
২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রফিকুল ইসলাম তাঁর পাঁচ ভাই—এস এম নুরুল ইসলাম, এস এম দিদারুল ইসলাম, এস এম আমিনুল ইসলাম, এস এম মনিরুল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমানের নামে গোপালগঞ্জ রেলস্টেশনের আশপাশে ৪২ কোটি টাকার জমি কেনেন। ভাইদের নামে পূর্বাচলে প্লট বুকিং দিয়ে তার কিস্তি দিচ্ছেন। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের পূর্বাচল, ঢাকা প্রকল্পে পাঁচটি প্লট বুকিং দিয়ে কিস্তি দিচ্ছেন। প্রতিটি প্লটের কিস্তি মূল্য এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া রফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত দলিল লেখক উজ্জ্বল মামুন চৌধুরী ও ভাই মাহফুজুর রহমানের নামে গোপালগঞ্জ সদরের সুকতাইল ইউনিয়নের সুকতাইল গ্রামে ১৬ কোটি টাকা মূল্যে ৪০ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। এই জমির ওপর বিশাল মৎস্য খামার গড়ে তোলা হয়েছে।
রফিকুল ইসলামের ভাই আমিনুল ইসলাম একজন বেকার। অথচ তিনি বাসা নম্বর ১০৯, ফ্ল্যাট নম্বর ১৮ ডি, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, কাকরাইলে এক কোটি ১০ লাখ
টাকা মূল্যের ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন। রফিকুল ইসলামের বড় ভাই এস এম নুরুল ইসলামের নামে ঢাকায় তিনটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন, যার মূল্য প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা। তিনি নাটরের চিনিকলের একজন কর্মচারী ছিলেন।
রফিকুল ইসলাম গোপালগঞ্জ সদর উপজেলাধীন গোপীনাথপুর হিন্দুপাড়ায়ও আট বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। তাঁর মেজো বোনের তিন মেয়ের নামে (মৌসুমী, নিশা ও রেশমি) সভারের নবীনগরে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, পুলিশের এই বিত্তশালী কর্মকর্তা প্রতিবছর সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০টি গরু এবং ৮ থেকে ১০টি ছাগল কোরবানি দেন। এভাবেই এরা দুর্নীতির মাধ্যমে দেশটাকে একটি চুরির একটি ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলে।
