মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তমদ্দুন মজলিস সিলেট জেলা ও বিভাগীয় শাখার যৌথ উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বক্তারা বলেন, ফররুখ আহমদের সাহিত্যকর্ম কেবল কাব্যসৌন্দর্যের অনন্য নিদর্শন নয়; বরং আত্মপরিচয়ের সংকট অতিক্রম, আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী প্রেরণা। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাধারা পৌঁছে দিতে নিয়মিত পাঠচর্চা, গবেষণা ও যথাযথ মূল্যায়নের ওপরও তাঁরা গুরুত্বারোপ করেন।
১৯ অক্টোবর ২০২৬ সিলেটের কুমারপাড়ায় সংগঠনের অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন তমদ্দুন মজলিস সিলেট জেলা শাখার সভাপতি ড. তুতিউর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন ভাষাসৈনিক অধ্যক্ষ মসউদ খান। ‘কবি ফররুখ আহমদের কবিতায় মুসলিম জাগরণ’ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন তমদ্দুন মজলিস সিলেট বিভাগীয় শাখার সভাপতি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মদন মোহন কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল এম আতাউর রহমান পীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন শামসীর হারুনুর রশীদ ও সৈয়দ রেজাউল হক। সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন কবি কামাল আহম
প্রধান আলোচক এম আতাউর রহমান পীর বলেন, ফররুখ আহমদের কবিতা আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও মুসলিম জাগরণের এক বলিষ্ঠ কাব্যিক উচ্চারণ। তাঁর কবিতার অন্যতম শক্তি হলো আত্মবিস্মৃত জাতিকে নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আদর্শের মুখোমুখি দাঁড় করানো। তিনি অতীতের গৌরব স্মরণ করিয়েই থেমে থাকেননি; বরং আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কাব্যে মুসলিম জাগরণ নিছক আবেগের প্রকাশ নয়; বরং আত্মসচেতনতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও আদর্শনিষ্ঠ জীবন গঠনের প্রত্যয়।
তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক শাসন, সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে ফররুখ আহমদ মুসলিম সমাজের স্বতন্ত্র পরিচয় ও ঐতিহ্যচেতনাকে কবিতার শক্তিতে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ সাত সাগরের মাঝি এ জাগরণী চেতনার অনন্য নিদর্শন। সমুদ্র, জাহাজ, মাঝি ও অভিযাত্রার প্রতীকের মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিকূলতা জয়, লক্ষ্য অর্জন এবং নতুন দিগন্তের সন্ধানে এগিয়ে যাওয়ার সাহসী প্রত্যয় তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতার এই অভিযাত্রা মূলত স্থবিরতা ভেঙে জাগরণ, আত্মবিশ্বাস ও নবনির্মাণের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
এম আতাউর রহমান পীর আরও বলেন, ফররুখ আহমদের সাহিত্যকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে দেখলে তাঁর কাব্যচিন্তার ব্যাপ্তি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তাঁর কবিতার আত্মমর্যাদাবোধ, নৈতিক অবস্থান, ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা ও প্রতিকূলতা অতিক্রমের প্রত্যয় বর্তমান প্রজন্মের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তাই কবিকে আনুষ্ঠানিক স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর রচনার গভীর পাঠ, সাহিত্যিক মূল্যায়ন ও গবেষণাকে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহিত্যসভা ও পাঠচক্রের মাধ্যমে তাঁর কবিতা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
প্রধান অতিথি ভাষাসৈনিক অধ্যক্ষ মসউদ খান বলেন, ফররুখ আহমদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাঁর কবিতায় ঐতিহ্যচেতনা, আত্মমর্যাদা ও নৈতিক মূল্যবোধের যে প্রকাশ ঘটেছে, তা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হতে এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় উপলব্ধি করতে সহায়তা করতে পারে। কবির সাহিত্যকর্মের যথাযথ পাঠ, চর্চা ও মূল্যায়নের মাধ্যমেই তাঁর চিন্তা ও আদর্শ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
বিশেষ অতিথি শামসীর হারুনুর রশীদ বলেন, ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও চিন্তার জগৎ নির্মাণ করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের যথাযথ মূল্যায়ন ও ব্যাপক প্রচারের জন্য নিয়মিত সাহিত্যসভা, পাঠচক্র ও গবেষণামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা জরুরি।
বিশেষ অতিথি সৈয়দ রেজাউল হক বলেন, ফররুখ আহমদের কবিতায় মানবিক মূল্যবোধ, ঐতিহ্যচেতনা ও আত্মমর্যাদার যে প্রকাশ ঘটেছে, তা পাঠকের চিন্তা ও মননকে সমৃদ্ধ করে। তাঁর সাহিত্যকর্মের গভীরে প্রবেশ করলে কেবল কবির সময় ও সমাজকেই জানা যায় না, বরং আত্মপরিচয় ও আদর্শনিষ্ঠ জীবন গঠনের প্রেরণাও পাওয়া যায়। তাই নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর কবিতা পাঠের আগ্রহ সৃষ্টি এবং তাঁর সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও গবেষণার পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. তুতিউর রহমান বলেন, ফররুখ আহমদকে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাঁর কবিতার অন্তর্নিহিত বক্তব্য, ঐতিহ্যচেতনা ও জাগরণী আহ্বান গভীরভাবে পাঠ ও অনুধাবন করতে হবে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্যপ্রীতি, ইতিহাসসচেতনতা ও আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তুলতে তাঁর সাহিত্যচর্চা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন কবি ফয়জুল হক ও সৈয়দ বদরুল ইসলাম, কবি মফিক মোহাম্মদ প্রমুখ। বক্তারা কবি ফররুখ আহমদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা সম্প্রসারণ, তাঁর রচনার ব্যাপক প্রচার এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিয়মিত সাহিত্যপাঠের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
