একসময় স্বল্প খরচে চক্ষুসেবা দেওয়ার জন্য সিলেটজুড়ে পরিচিত ছিল জালালাবাদ চক্ষু হাসপাতাল। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের চোখের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রতিষ্ঠানটি এখন নানা সংকটে জর্জরিত। পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিরোধ, আয় কমে যাওয়া, জনবলসংকট ও দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় হাসপাতালটির কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে চিকিৎসাসেবা ও রোগীর উপস্থিতিতেও।
সিলেট মহানগরীর মেজরটিলায় ১৯৭৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জালালাবাদ অন্ধ কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় হাসপাতালটি। সরকারি-বেসরকারি অনুদান এবং নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে চক্ষু পরীক্ষা, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছে। একসময় চক্ষু চিকিৎসায় হাসপাতালটির সুনামও ছিল। সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হতো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে হাসপাতালটির পরিচালনা পর্ষদ ছিল ২৫ সদস্যের। পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক সভাপতি এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করতেন। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন জীবন সদস্য ও বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজনেরা।
পরবর্তী সময়ে তৎকালীন জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ আগের কমিটি ভেঙে একটি আহ্বায়ক বা এডহক কমিটি গঠন করেন বলে জানা গেছে। এতে আগের পরিচালনা পর্ষদের বেশ কয়েকজন জীবন সদস্য বাদ পড়েন। একই সময়ে হাসপাতালের আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত কিছু দোকানপাট ভেঙে ফেলা হয়। এ নিয়ে আগের কমিটির নেতৃবৃন্দ আদালতের দ্বারস্থ হন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনার পর হাসপাতালের আয় কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতির কারণে ২০২০-২০২১ সালের পর থেকে হাসপাতালটির লাইসেন্স নবায়ন হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে বহির্বিভাগে রোগীর উপস্থিতি এবং অস্ত্রোপচারের সংখ্যা কমছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন জানান, প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল না থাকায় ২০২০-২০২১ সেশনের পর লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২১-২০২২ সালের জন্য লাইসেন্স নবায়নের ফি জমা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে লাইসেন্স হালনাগাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
হাসপাতালের আগের পরিচালনা পর্ষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. সিদ্দিকুর রহমান অভিযোগ করেন, তৎকালীন জেলা প্রশাসক নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই এডহক কমিটি গঠন করেছিলেন। তাঁর দাবি, হাসপাতালের আয়ের উৎস হিসেবে থাকা বেশ কিছু দোকানপাট ভেঙে ফেলায় প্রতিষ্ঠানটির আয় কমে গেছে। বর্তমান কমিটিতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা থাকলেও লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। তাঁর মতে, সেবার মান ও রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে এসব বিষয় ভূমিকা রেখেছে।
তবে হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি ও সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আগের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ এবং লাইসেন্স নবায়নের উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে হাসপাতালটিকে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে। ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধের পর আগামী কয়েক মাসের মধ্যে লাইসেন্স নবায়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ চক্ষু হাসপাতালকে ঘিরে পরিচালনাগত বিরোধ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা এবং আইনগত অনুমোদন হালনাগাদ করা গেলে হাসপাতালটির চক্ষুসেবা আবারও গতিশীল করা সম্ভব হতে পারে।
