এমদাদ চৌধুরী দীপু : সাতক্ষীরা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী মনিরুজ্জামান ছিলেন একজন দুর্নীতিবাজ পুলিশ অফিসার। তার বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, স্বর্ণলুট, ভিন্নমত দমনসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালনের পুরো সময় অবৈধ অর্থের নেশায় বেপরোয়া ছিলেন কাজী মনিরুজ্জামান। সাতক্ষীরা জেলায় থাকাকালীন পুলিশ সুপার কার্যালয় ও থানাগুলোকে তিনি অনাচারের দুর্গে পরিণত করেছিলেন।

কাজী মনিরুজ্জামান গত বছর (২০২৩) সাতক্ষীরায় ২০টি স্বর্ণবার লুট করেন। স্বর্ণবার লুটের পর উল্টো তিনি স্বর্ণ ব্যবসায়ী শেখ শফিউল্লাহ মনির বিরুদ্ধে ডাকাতির মামলা দেন। ওই সময় ভাঙচুর করা হয় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ ঘটনায় গত বছরের ২ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের আইজিপি’স কমপ্লেইন মনিটরিং সেলে লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। কিন্তু বিচার পাননি।

কাজী মনিরুজ্জামান নিজের দুর্নীতি এবং অনিয়মকে ধামাচাপা দিতে জানান, শফিউল্লাহ স্বর্ণ চোরাকারবারি। তা ছাড়া জামায়াত-বিএনপির অর্থদাতা। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সংস্থার নাম করে স্বর্ণ নিয়ে এসে মিথ্যা কথা বলে গায়েব করে দেয়। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী এসপির এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি জানান, ব্যবসায়িক অংশীদার সঞ্জয় কুমার দাসের সঙ্গে যৌথভাবে দীর্ঘদিন ধরে সব নিয়ম-কানুন মেনে জুয়েলারিসহ একাধিক ব্যবসা করছেন তারা। তার অভিযোগ, পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামানের নির্দেশে সাদা পোশাকধারী পুলিশ গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তার ২০ পিস স্বর্ণের বার লুটের পর ব্যক্তিগত গাড়িচালক সাইফুলকে চোখ ও হাত-পা বেঁধে সাতক্ষীরা বাইপাসের জামতলা এলাকায় ফেলে যায়।

মনিরুজ্জামানের সাবেক কর্মস্থল সাতক্ষীরা জেলায় তার ব্যক্তিগত আক্রোশ এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তিনি বেছে বেছে অর্থশালীদের আটক করতেন। এরপর মিথ্যা মামলা আর ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে আদায় করতেন মোটা অঙ্কের টাকা। এ ছাড়া বিদেশ থেকে আসা যেসব স্বর্ণের চালান সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে পাচার হতো সেগুলো লুট করতে কাজী মনিরুজ্জামান সাদা পোশাকধারী বিশেষ টিম গড়ে তোলেন। এর মাধ্যমে চালিয়েছেন তার দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ড। এই মনিরুজ্জামান পুলিশ সুপার হয়ে যাওয়ার পর আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী মত দমনের নামে শুরু করেন অত্যাচার-নির্যাতন এবং অর্থ লুট। তার নিজের প্রভাবকে খাটিয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগের কোনো এমপিও তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলার সাহস পেতো না।

সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, মনিরুজ্জামানের নির্দেশে দিনভর অভিযান চালিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের আটক করতেন তারা। এরপর রাত ১২টার পর তাদের হাজির করা হতো মনিরুজ্জামানের সামনে। সেখানে আটককৃতদের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় ৫০ হাজার থেকে ৫০ লাখ টাকা আদায় করা হতো। যারা দিতে পারতেন না তাদের বিভিন্ন মামলা দিয়ে হয়রানি করা হতো। মনিরুজ্জামানের ঘুষকাণ্ডের ভুক্তভোগী জেলার আলিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ বলেন, বিভিন্ন সময়ে তাকে আটক করে এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা নিয়েছেন কাজী মনিরুজ্জামান। মনিরুজ্জামানের নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি সাংবাদিকও। হাসান নামে জেলার স্থানীয় এক সাংবাদিক জানান, তাকে তুলে নিয়ে গুমের ভয় দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকা আদায় করেন মনিরুজ্জামান। তার পরিবার এই এসপির কারণে এখন প্রায় নিঃস্ব। বিভিন্ন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলার পুলিশ সুপার থাকাকালীন দেড় বছরে তিনি শতকোটি টাকার বেশি লুট করেছেন। মোটা টাকা ব্যয় করে তিনি পোস্টিং নিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে। ছিলেন পুলিশের আলোচিত ডিআইজি হারুন উর রশিদের স্নেহভাজন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বিরোধী মত দমনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। কাজী মনিরুজ্জামানের মতো অফিসাররা পুলিশকে নিজের সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

৫ আগস্টের পর থেকে আত্মগোপনে থাকা এই পুলিশ কর্মকর্তাকে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট বরখাস্ত করা হয়। এই খবরে সাতক্ষীরার মানুষ এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *