নিজস্ব প্রতিবেদক

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেছেন, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আমাদের সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল প্রতীক। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা আমাদের সমাজে থেকে যাবে। অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় এবং হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজনের অবসানই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

বুধবার (২১ অক্টোবর) সিলেট নগরীর চাঁদনীঘাটে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার প্রতিমা নিরঞ্জন কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, সিলেটের একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হচ্ছে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সম্মান করা এবং বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার; আর উৎসবের আনন্দ সবার।

তিনি বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নগরবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক সব উৎসব যেন নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও আনন্দময় পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এবার দুর্গাপূজা উপলক্ষে মহানগরীর ৮৫টি পূজামণ্ডপের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা ও মণ্ডপভিত্তিক ৪০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুণ্যার্থীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সড়ক মেরামত, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও পূজামণ্ডপে আলোকসজ্জা এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

সিসিক প্রশাসক বলেন, পূজামণ্ডপ ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, মণ্ডপভিত্তিক জোন নির্ধারণ, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজা ও বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নাগরিক সেবার বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের জন্য সিটি করপোরেশনের বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়। ফলে পূজা উদযাপন কমিটি কিংবা নগরবাসী কোনো নাগরিক সমস্যা বা জরুরি বিষয়ে দ্রুত যোগাযোগ করতে পেরেছেন।

তিনি আরও বলেন, বিসর্জনকে কেন্দ্র করে চাঁদনীঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উৎসবের আনন্দ সবার জন্য নিরাপদ রাখতে সবাইকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের প্রতি সবাইকে বাড়তি খেয়াল রাখতে হবে।

আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতের ভিন্নতা থাকলেও ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রশ্নে কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি যেন কোনো ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, সেটি নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। গুজব, অপপ্রচার, উসকানি বা বিভাজন সৃষ্টিকারী কোনো তথ্য যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি সিলেট চাই, যেখানে একজন মুসলমান নিশ্চিন্তে ঈদ উদযাপন করবেন, একজন হিন্দু নিশ্চিন্তে দুর্গাপূজা করবেন, একজন বৌদ্ধ ও একজন খ্রিষ্টানও নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করবেন। এটাই বাংলাদেশের ঐতিহ্য, এটাই সিলেটের সম্প্রীতির ঐতিহ্য।

তিনি বলেন, বিসর্জনের পর নদীর তীর ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও আমাদের সবার। সিলেটকে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও সম্প্রীতির নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভারতের সহকারী হাই কমিশনার অনিরুদ্ধ দাশ ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার দাস ও মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাশের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মলয় পুরকায়স্থ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোপীকা শ্যাম পুরকায়স্থ এবং সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি সুব্রত দেব প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *