এমদাদ চৌধুরী দীপু : চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে তার একাধিক গুরুতর অপকর্মের প্রমাণ মিলেছে। এখানে এডিসি কামরুল হাসানের প্রধান প্রধান অপকর্ম ও দুর্নীতির বিবরণ তুলে ধরা হলো:
এডিসি কামরুল হাসান যখন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন আদালতের প্রসিকিউশন শাখার দায়িত্বে ছিলেন, তখন আদালতের হাজতখানায় থাকা আসামিদের খাবারের সরকারি বরাদ্দ জালিয়াতি করে আত্মসাৎ করেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, হাজতিদের জন্য দৈনিক বরাদ্দ ছিল ১৫০ টাকা। কামরুল হাসান ও তার সহযোগীরা হাজতিদের কোনো খাবার না দিয়েই প্রতি জনের নামে ভুয়া ভুয়ো বিল তৈরি করতেন এবং সরকারের কাছ থেকে টাকা তুলে নিতেন। অন্যদিকে, হাজতিদের খাবারের জন্য তাদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হতো। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে এভাবে প্রায় ১৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা সরকারি তহবিল থেকে আত্মসাৎ করার প্রমাণ পায় পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কামরুল হাসান তার ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে দুদক তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২১ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করে। তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ কোটি কোটি টাকা, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
তদন্তে কামরুল ও তার স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ রাজকীয় সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে আছে আলিশান বাড়ি, খুলশীতে ডিআইজি অফিসের পাশে ২,৫৭০ বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং সিডিএ অনন্যা আবাসিক এলাকায় প্লট। রয়েছে ঢাকার সাভারে একাধিক ফ্ল্যাট এবং সাভার সিটি সেন্টার ও সাভার সিটি টাওয়ারে বাণিজ্যিক স্পেস এবং দোকান। কামরুল হাসানের স্ত্রীর নামে নিবন্ধিত ৪টি লাইটারেজ জাহাজ (পণ্যবাহী জাহাজ) রয়েছে সেগুলোর নাম: এমভি প্যাসিফিক রাইডার, এমভি পানামা ফরেস্ট-১, এমভি রাইসা তারান্নুম এবং বার্জ আল বাইয়েত।
এইসব অপকর্মের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়:
২০২৪ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের মহানগর স্পেশাল জজ আদালত এডিসি কামরুল ও তার স্ত্রীর ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
সিএমপির অভ্যন্তরীণ তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে সুপারিশ পাঠানো হয়।
১৯৮৯ সালে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে যোগ দেওয়া কামরুল হাসান পদোন্নতি পেয়ে এডিসি পদ পর্যন্ত পৌঁছান। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে হাজতিদের মুখের খাবার কেড়ে নেওয়া এবং কোটি কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছেন।
বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান দুর্নীতির মামলা ও তদন্তের মুখোমুখি আছেন।
