ফিলাডেলফিয়ার খ্যাতনামা চিকিৎসক থেকে সিলেটের অসহায় কিডনি রোগীদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক উদ্যোগের কারিগর। অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের জীবন ও কর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাক্ষেত্রে সাফল্য, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং নিজ এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার অঙ্গীকার।
যুক্তরাষ্ট্রের টেম্পল ইউনিভার্সিটির চিকিৎসা অনুষদে অধ্যাপনার পাশাপাশি কিডনি রোগের চিকিৎসা ও গবেষণায় অবদান রেখে চলেছেন তিনি। অন্যদিকে, সিলেটে কিডনি ফাউন্ডেশন গড়ে তোলার মাধ্যমে স্বল্প খরচে ও বিনামূল্যে ডায়ালাইসিসের সুযোগ তৈরিতেও ভূমিকা রাখছেন এই চিকিৎসক।
শহীদ চিকিৎসকের সন্তান, শিক্ষাবিদ মায়ের উত্তরসূরি
ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের জন্ম সিলেটে। তাঁর বাবা শহীদ অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দিন আহমেদ, এফআরসিএস, সিলেট মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তিনি শহীদ হন।
তাঁর মা হোসনে আরা আহমেদ ছিলেন শিক্ষাবিদ এবং সিলেট মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এমন পরিবারে বেড়ে ওঠা জিয়াউদ্দিন আহমেদ ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-২৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে এমবিবিএস শেষ করে উচ্চশিক্ষা ও চিকিৎসা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে মার্সি ক্যাথলিক মেডিকেল সেন্টার এবং মেডিকেল কলেজ অব পেনসিলভানিয়ায় প্রশিক্ষণ নেন। পরে কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।
পাঁচটি বিষয়ে বোর্ড সনদ, যুক্তরাষ্ট্রে স্বীকৃতি
ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ ইন্টারনাল মেডিসিন, নেফ্রোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন, জেরিয়াট্রিক মেডিসিন এবং ক্লিনিক্যাল হাইপারটেনশন, এই পাঁচটি বিষয়ে আমেরিকান বোর্ড সার্টিফিকেশন অর্জন করেছেন বলে তাঁর পরিচিতিমূলক তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানে তিনি লুইস কাটজ স্কুল অব মেডিসিন অ্যাট টেম্পল ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল মেডিসিনের অধ্যাপক। একই সঙ্গে ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিনের প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবেও তাঁর পরিচয় রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের কারণে সৃষ্ট কিডনি জটিলতার চিকিৎসা ও গবেষণা তাঁর বিশেষ আগ্রহের ক্ষেত্র।
চিকিৎসাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এলিস আইল্যান্ড মেডেল অব অনার পেয়েছেন। পাশাপাশি ফিলাডেলফিয়া ম্যাগাজিনের ‘টপ ডক্টরস ২০২৬’ তালিকাতেও তাঁর নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেটে কিডনি চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রে পেশাগত সাফল্য অর্জন করলেও সিলেটের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার ভাবনা থেকে যায় তাঁর মধ্যে। কিডনি রোগের চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী শহরে যাতায়াত এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার চাপ অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার লক্ষ্যেই কিডনি ফাউন্ডেশন সিলেট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রয়াত জাহিন আহমেদ এবং বীর প্রতীক কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুস সালাম। তাঁদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের মা হোসনে আরা আহমেদ এবং ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
শুরুতে সিলেটের শাহজালাল উপশহরে প্রায় ১২ হাজার বর্গফুটের একটি ভাড়া বাসায় ছোট পরিসরে ডায়ালাইসিস সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে উদ্যোগটি সম্প্রসারিত হয়ে বড় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর্যায়ে পৌঁছায়।
নাজিরগাঁওয়ে ২০০ শয্যার কিডনি হাসপাতাল
সিলেটের নাজিরগাঁও, টেমুখী এলাকায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে ২০০ শয্যার কিডনি হাসপাতাল। স্থানীয় ব্যবসায়ী লায়ন জুবায়ের আহমেদ চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের দান করা জমিতে ২০১৮ সালে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ ২০২৪ সালের মাঝামাঝি শেষ হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
হাসপাতালটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এই হাসপাতালের লক্ষ্য কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করা। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের জন্য কম খরচে কিংবা বিনামূল্যে ডায়ালাইসিসের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিডনি রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় নিয়মিত ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয় অনেক রোগীর। এ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। সে কারণে সিলেটে এ ধরনের হাসপাতালের কার্যক্রম স্থানীয় রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রবাসের সাফল্য, শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা
ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের কর্মজীবনের একটি দিক যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ও গবেষণাক্ষেত্রে অর্জিত স্বীকৃতি। অন্য দিকটি সিলেটের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজ করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
কিডনি ফাউন্ডেশন সিলেটের মাধ্যমে স্বল্প খরচে ও বিনামূল্যে ডায়ালাইসিসের সুযোগ সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা তাঁর সেই দায়বদ্ধতারই প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজ এলাকার মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে তাঁর এই উদ্যোগ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
সূত্র: Ghatona Digital
