নিজাম উদ্দীন সালেহ 

ফেইসবুক খুললেই এখন প্রতিদিন চোখে পড়ে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার, এমনকি মৃত্যুর অসংখ্য খবর। একসময় সবাই ভাবতেন স্ট্রোক মানে বয়স্ক মানুষের রোগ। ৬০ পেরোনো বাবা বা দাদার হঠাৎ একপাশ অবশ হয়ে যাওয়া। সেই ধারণা এখন ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল  ‘নিউরোলজি’তে প্রকাশিত এক গবেষণা সবার চোখ খুলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর সিনসিনাটি ও উত্তর কেনটাকি অঞ্চলে ১৯৯৩ থেকে ২০২০, প্রায় ২৭ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যে স্ট্রোক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

১৯৯৩ সালে প্রতি ১ লাখ তরুণের মধ্যে ৩৩.৯ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হতেন। ২০২০ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২.২ জনে। অর্থাৎ বৃদ্ধি ৮৩ শতাংশ।এটা শুধু আমেরিকার গল্প নয়। বাংলাদেশেও একই চিত্র।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগ বলছে, এখন শিশুদের মধ্যেও স্ট্রোক হচ্ছে। প্রতি ১ লাখ নবজাতকের মধ্যে ২ জন। আর তরুণদের মধ্যে ঝুঁকি বাড়ার পেছনে চিকিৎসকরা দায়ী করছেন আমাদের বদলে যাওয়া জীবনকে। এমন ব্যক্তি যার বয়স ২৫, কিন্তু প্রেশার ১৫০/৯৫। কোনোদিন মাপেননি। ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত লবণ, ঘুম কম, নীরবে প্রেশার বাড়ছে।

সিগারেট, ই-সিগারেট, গাঁজা, অ্যাম্ফিটামিন এগুলো রক্তনালীকে সরু করে দেয়, রক্ত জমাট বাঁধায়। গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রোকের ক্লাসিক কারণগুলোর মধ্যে ধূমপান এখনো ১ নম্বরে। 

ঢাকা মেডিকেলের ডা. সুমন রানা বলেছেন, মোবাইল সরাসরি স্ট্রোক করে না, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ডেকে আনে, রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে। 

আজকের বাচ্চারা বড় হচ্ছে চিকেন ফ্রাই আর কোমল পানীয়ে। ২০ বছর বয়সেই ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল। এগুলো রক্তনালীর দেয়াল শক্ত করে দেয়।

কম বয়েসী নারীদের মধ্যে যারা জন্মনিয়ন্ত্রণে ইস্ট্রোজেনযুক্ত পিল খান, ধূমপান করেন, মাইগ্রেনে ভোগেন, কিংবা গর্ভাবস্থায় প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ায় ভুগেছেন, তাদের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেশি। মানসিক চাপ, ঘুমহীনতা ও এনার্জি ড্রিংক পান, রাত জাগা, ক্রনিক স্ট্রেস, এনার্জি ড্রিংক এগুলো হঠাৎ প্রেশার ও হার্টবিট বাড়িয়ে দেয়, যা তরুণ বয়সে স্ট্রোকের ট্রিগার হয়। 

গবেষণার প্রধান লেখক ডা. এমিলি ফিশার বলেছেন, “তরুণদের মধ্যে স্ট্রোক এখন সাধারণ হয়ে উঠছে, কিন্তু ভালো খবর হলো তারা বেঁচে যাচ্ছেন বেশি।” কিন্তু বেঁচে যাওয়াটাই কি শেষ কথা?

একজন ৩০ বছরের ছেলে যদি স্ট্রোকে পঙ্গু হয়ে যায়, তাকে ৩০-৪০ বছর ধরে সেই জটিলতা নিয়ে বাঁচতে হবে। চাকরি, সংসার, স্বপ্ন, সব থমকে যায়। পরিবারের ওপর নামে আর্থিক ও মানসিক পাহাড়।

স্ট্রোকের লক্ষণগুলো তরুণরা প্রায়ই মাইগ্রেন বা ক্লান্তি ভেবে উড়িয়ে দেয়। হঠাৎ হাঁটতে অসুবিধা, মাথা ঘোরা। এক চোখে হঠাৎ ঝাপসা দেখা। মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া। এক হাত বা পা হঠাৎ দুর্বল, তুলতে না পারা। কথা জড়িয়ে যাওয়া, বুঝতে না পারা এ ধরণের লক্ষণ থাকলে সময় নষ্ট না করে সাথে সাথে হাসপাতালে যান। ৪.৫ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু হলে মস্তিষ্ক বাঁচানো সম্ভব।

এ অবস্থায় ২০ বছর পেরোলেই বছরে একবার প্রেশার, সুগার, কোলেস্টেরল মাপুন। ধূমপান, ভ্যাপ, এনার্জি ড্রিংক আজই ছাড়ুন। দিনে ৩০ মিনিট হাঁটুন, মোবাইল থেকে উঠুন। ফাস্ট ফুড কমান, পানি খান, ৭ ঘণ্টা ঘুমান। স্ট্রেস হলে কথা বলুন, চেপে রাখবেন না।

তরুণ বয়স মানেই অজেয় নয়। শরীর আমাদের কাছে ঋণ চায় না, কিন্তু হিসাব রাখে। আজকের ছোট অবহেলা কাল বড় স্ট্রোক হয়ে ফিরে আসতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *