মৌলভীবাজার প্রতিনিধি :
দলের সিদ্ধান্ত মেনে প্রার্থীদের পক্ষে কাজের আহ্বান নাসের রহমানের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় দলীয় প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম. নাসের রহমান। অন্যদিকে, সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যানের ১২টি পদসহ ১১২টি সাধারণ সদস্য পদে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয় চান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন। এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন পেতে আগ্রহী সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের আগামী রবিবারের মধ্যে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতির কাছে জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) জমা দেওয়ার নির্দেশনার কথা সভায় জানানো হয়েছে। নির্বাচনী প্রস্তুতিতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম মানুষের কাছে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন দলীয় নেতারা।
বৃহস্পতিবার বিকেলে মৌলভীবাজার শহরের বেঙ্গল কমিউনিটি সেন্টারে মৌলভীবাজার সদর উপজেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটির পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় এসব বক্তব্য উঠে আসে। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংসদের ভূমি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় এম. নাসের রহমান এমপিকে সদর উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাসের রহমান বলেন দল যাকে সমর্থন দেবে তার পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দলের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
দলের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। নাসের রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছের জনপ্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান। এলাকার উন্নয়ন নাগরিক সমস্যা সমাধান এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই যোগ্য ও জনসম্পৃক্ত প্রার্থীদের বিজয়ী করতে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। বিএনপি যখনই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, তখনই জনগণের কল্যাণে কাজ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ও আর্থসামাজিক অগ্রগতিকে দলটি সব সময় গুরুত্ব দিয়েছে। বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে ধরে নাসের রহমান বলেন,ফ্যামিলি কার্ড,কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এসব উদ্যোগের সুফল যাতে সাধারণ মানুষ পায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সদর উপজেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটির নেতাদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। পারস্পরিক ঐক্য, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জনগণের আস্থা অর্জন এবং এলাকার মানুষের পাশে থাকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ‘মিটিং আয়োজন করলেই পুলিশ এসে ডিস্টার্ব করত’
সভায় নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নাসের রহমান বলেন আমার সাড়ে ২২ বছর জেলা বিএনপির সভাপতি থাকাকালে মাত্র সাড়ে চার বছর ছিল সরকারি দলের সময়। বাকি ১৮ বছরই ছিলাম জেলা বিএনপির সভাপতি। বিরোধী দলে থাকাবস্থায় এই সময়ে আমরা বেশির ভাগ সময়ই এ ধরনের অনুষ্ঠান করতে পারিনি। মিটিং আয়োজন করলেই পুলিশ এসে ডিস্টার্ব করত, বাধা দিত।
তিনি আরও বলেন শেষ পর্যন্ত বাহারমর্দন হয়েছিল মিটিং করার একমাত্র জায়গা। শহরের কোথাও অনুষ্ঠান করতে গেলেই সমস্যা হতো। স্বৈরাচারের সময় এভাবেই আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে হয়েছিল।” সদরের ১২ চেয়ারম্যান ও ১১২ মেম্বার পদে জয় চায় বিএনপি সভায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নেই বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীদের বিজয়ী করার পাশাপাশি ১১২টি সাধারণ সদস্য পদেও দলের সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচিত করতে চান তারা। ময়ূন বলেন আমরা চাচ্ছি এবার মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যানই আমাদের দলের নির্বাচিত হয়ে আসুক। আমি দেখেছি সদরে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আমরা দেখছি, কারা কারা নির্বাচিত হয়ে বিজয়ী হতে পারবেন। এবার চাই, সদরে ১২টা চেয়ারম্যানই বিজয়ী হতে এবং ১২টি ইউনিয়নে ১১২ জন মেম্বার আমাদের দলের নির্বাচিত হয়ে আসতে। আমরা যেন এবারকার এ সুযোগটাকে অবহেলা না করি কাজে লাগাতে পারি। এই আবেদনটা আপনাদের কাছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপির চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রয়োজন। নেতাদের সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালিত হলে দলের কোন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন মাঠে সক্রিয় রয়েছে এবং কারা পিছিয়ে আছে তা সহজেই বোঝা যাবে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে ময়ূন বলেন, দলের কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে গ্রাম থেকে ওয়ার্ড ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হয়েছে। এতে দলের ক্ষতি হয়নি বরং নেতাকর্মীরা একে অন্যের কাছে গেছেন এবং নিজেদের পক্ষে সমর্থন চেয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের এই প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ময়ূন বলেন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের যেন মূল্যায়ন থাকে। সে বিষয়টা যেন নেতৃবৃন্দ সকলে খেয়াল রাখেন। আর আমাদের এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে এই চেয়ারম্যান ও মেম্বারগুলো যেন আমরা পাই। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে শুধু দলের নেতাকর্মীদের সমর্থন পেলেই হবে না, সাধারণ ভোটারদের কাছেও যেতে হবে। মানুষের কল্যাণে ও এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে পারলে ভোটাররা বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে রায় দেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সভায় জানানো হয়, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন লাভে আগ্রহী সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের আগামী রবিবারের মধ্যে নিজেদের জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতির কাছে জমা দিতে হবে। দলীয় সমর্থন প্রত্যাশী প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়সীমার বিষয়টি সভায় নেতাকর্মীদের অবহিত করা হয়।
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এম.নাসের রহমানের বিজয়ের কৃতিত্ব দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি রেজিনা নাসের। তিনি বলেন আপনাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। বিগত সংসদ নির্বাচনে আমাদের যে বিশাল বিজয়,সেটা শুধু আমাদের না, আপনাদের সবার কৃতিত্ব। আপনারা সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন বলেই আমরা আজ এই বিশাল বিজয় আনতে পেরেছি।
নবগঠিত কমিটির একজন সদস্য হিসেবে নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়ে রেজিনা নাসের আশা প্রকাশ করেন, নতুন কমিটি ভবিষ্যতে মৌলভীবাজারের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
উন্নয়ন কার্যক্রম প্রচারে মনিটরিং টিম গঠনের পরামর্শ রিপনের
সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সংসদ সদস্য এম. নাসের রহমানের মাধ্যমে এলাকায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আব্দুর রহিম রিপন। প্রয়োজনে দুই থেকে চারটি ইউনিয়ন নিয়ে পৃথক মনিটরিং টিম গঠনের পরামর্শ দেন তিনি।
রিপন বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রতিবন্ধী ভাতা, ঢেউটিনসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা ইউনিয়নভিত্তিকভাবে কারা পাচ্ছেন, তা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করতে নেতাকর্মীদের আরও সক্রিয় হতে হবে।
তিনি বলেন দলের নেতৃবৃন্দের সফলতাই আমাদের দলের সফলতা।
সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানো, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান মজনুর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মো. মারুফ আহমেদের পরিচালনায় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন, জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি রেজিনা নাসের, সদস্যসচিব আব্দুর রহিম রিপন,জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও নাসের রহমানের রাজনৈতিক সচিব-১ আলহাজ মো. আব্দুল মুকিত, রাজনৈতিক সচিব-২ মো. ফখরুল ইসলাম এবং সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. হেলু মিয়াসহ অন্য নেতারা।
এ সময় সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অন্যান্য সদস্য, সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. বদরুল আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. ফয়সল আহমদ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বকসী মিছবাউর রহমানসহ নবগঠিত কমিটির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক সমন্বয়, জনসম্পৃক্ততা এবং তৃণমূলের সক্রিয়তাকে সামনে রেখে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রস্তুতি জোরদার করার তাগিদ দেন নেতারা।
