নিজাম উদ্দীন সালেহ
চাঁদাবাজি দমনে নতুন আইন আসছে, আইজিপির এই ঘোষণা শুনে সাধারণ মানুষের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু সন্দিহান মানুষের প্রশ্ন, আইন তো ছিল, আইন আছে, তাহলে চাঁদাবাজি কমে না কেন? খুলনায় পুলিশ প্রধান যে আইনের কথা বললেন, তার সারকথা হলো, ভুক্তভোগী অভিযোগ না করলেও পুলিশ নিজে বাদী হয়ে মামলা করবে। ডিজিটাল প্রমাণ পেলেই ব্যবস্থা। শুনতে ভালো। কিন্তু তিক্ত সত্য হলো, বাংলাদেশে চাঁদাবাজি কোনো লুকানো অপরাধ নয়, এটি প্রকাশ্য, দিবালোকে, সবার চোখের সামনে হয়।
সিলেটের পাথর কোয়ারি থেকে বাসস্ট্যান্ড, খুলনার ঘাট থেকে ঢাকার ফুটপাত কোথায় চাঁদা ওঠে না? ট্রাক থামিয়ে, দোকান খুলতে, ফুটপাতে বসতে প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় চাঁদা তোলা হয়। ভুক্তভোগী থানায় যায় না, আইজিপি ঠিকই বলেছেন, ভয়ে যায় না। কিন্তু কেন ভয় পায়? কারণ যে চাঁদা তোলে, তার পেছনে অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকে, আর সেই ছত্রছায়া থানা পর্যন্ত বিস্তৃত।
মানুষ ভয় পায়, আজ মামলা করলে কাল পুলিশই তার নাম চাঁদাবাজকে জানিয়ে দেবে।
তাহলে নতুন আইন কী বদলাবে? যদি আইন হয় যে পুলিশ নিজে বাদী হয়ে মামলা করবে, তাহলে প্রথম প্রশ্ন, পুলিশ কি আসলেই করবে? নাকি এই আইন হবে নতুন আরেকটি চাঁদাবাজির হাতিয়ার? ভুক্তভোগী ছাড়াই পুলিশ মামলা দিতে পারলে, সেই মামলা দিয়ে নিরীহ ব্যবসায়ীকে হয়রানি করে টাকা আদায়ের সুযোগও তো তৈরি হবে। গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা আইজিপি নিজেই স্বীকার করেছেন, সেই দূরত্ব কি একটি আইন দিয়ে ঘুচবে?
মনে রাখা দরকার, চাঁদাবাজি দমনে আইনের অভাব কখনোই ছিল না। দণ্ডবিধির ৩৮৪ থেকে ৩৮৯ ধারায় চাঁদাবাজি স্পষ্টভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সমস্যা আইনে নয়, সমস্যা প্রয়োগে। প্রভাবশালী চাঁদাবাজকে ধরতে পুলিশের যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নিরপেক্ষতা দরকার, তা কি আছে?
আইজিপি বলেছেন, বলপ্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, না করলে দুর্বল বলা হয়। এই আক্ষেপ সত্য। কিন্তু মানুষ পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলেছিল যখন পুলিশ নিরীহ ছাত্রের বুকে গুলি চালিয়েছিল, আর দুর্বল বলছে যখন প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চললেও পুলিশ চোখ ফিরিয়ে থাকে। দুটো এক নয়। আমরা নতুন আইনকে স্বাগত জানাতে চাই, কিন্তু এ ব্যাপারে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে যে মামলা করবে, তার তদন্ত কে করবে? তাই বডি ক্যামেরা, ডিজিটাল এভিডেন্সের ফরেনসিক অডিট এবং স্বাধীন তদারকি ছাড়া এই আইন হবে ভয়ঙ্কর।
খুলনায় বসে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের গল্প শোনালে হবে না। সবার আগে দলীয় পরিচয় দেখে চাঁদাবাজকে ছেড়ে দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
যে ব্যবসায়ী ভিডিও পাঠাবে, তার পরিচয় গোপন রাখার এবং তাকে সুরক্ষা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা এই নতুন আইনে থাকতে হবে। নইলে কেউ প্রমাণ দেবে না। চাঁদাবাজি কোনো ছোট অপরাধ নয়। এটি একটি অর্থনীতিকে খুন করে। একটি ট্রাকে ৫০০ টাকা চাঁদা মানে বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ে। এটি কর্মসংস্থানকে খুন করে। নতুন আইন লাগবে, অবশ্যই লাগবে। কিন্তু আইনের চেয়েও বেশি লাগবে পুলিশের প্রতি মানুষের বিশ্বাস।
সেই বিশ্বাস ফিরে আসুক, তারপর আইন। আইন দিয়ে বিশ্বাস আসে না, বিশ্বাস দিয়ে আইন কার্যকর হয়।
