জুবায়ের আহমদ সাব্বির , গোয়াইনঘাট (সিলেট) প্রতিনিধি:

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পিয়াইন নদীর তীরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন ‘এক ডিমের মসজিদ’। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেও পরিচিত। ছোট্ট পরিসরের এই মসজিদটির নির্মাণশৈলী, গম্বুজের নান্দনিক কারুকাজ এবং অজানা ইতিহাস আজও মানুষের মনে কৌতূহল সৃষ্টি করে চলেছে। তবে মসজিদটির নির্মাণকাল ও প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে এখনো রয়েছে নানা রহস্য।

গোয়াইনঘাট সদর ইউনিয়নের কালাইউরা হাইডর গ্রামে অবস্থিত মসজিদটির চারপাশে রয়েছে সীমানাপ্রাচীর। প্রবেশপথের দুই পাশে থাকা পিলারে ফুটে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ। মসজিদের মূল কক্ষের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৮৪ মিটার এবং প্রস্থ ২ দশমিক ৯৫ মিটার। মাত্র একটি দরজা দিয়ে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। দরজাটি বেশ নিচু হওয়ায় মাথা নত করে প্রবেশ করতে হয়। ভেতরে এক সারিতে সর্বোচ্চ সাতজন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বর্তমানে এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত আজান ও জামাতে নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

মসজিদটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল অর্ধগোলাকার গম্বুজ। গম্বুজটির নিচের ব্যাস ৭ ফুট ৪ ইঞ্চি এবং শীর্ষবিন্দুর উচ্চতা ৩ দশমিক ২৭ মিটার। গম্বুজের চূড়ায় রয়েছে পদ্ম ও কলসের নকশা। চার কোণে রয়েছে ছোট চারটি বুরুজ বা মিনার। সেগুলোর চূড়াতেও কলস ও ফুলের কুঁড়ির নান্দনিক কারুকাজ দেখা যায়। পশ্চিম দেয়ালের মাঝখানে রয়েছে চারকোনা আকৃতির মেহরাব। দেয়ালের অলঙ্করণেও রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর ছাপ।

মসজিদের পূর্ব পাশে মুসল্লিদের জন্য খোলা বারান্দার মতো একটি স্থাপনা রয়েছে। পশ্চিম পাশে দেখা যায় দুটি পুরোনো কবরের ধ্বংসাবশেষ। মসজিদসংলগ্ন পুকুরের পানিও স্থানীয়দের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন রোগবালাই থেকে মুক্তির আশায় অনেকে এ পুকুরের পানি ব্যবহার করেন। সময়ের পরিবর্তনে মসজিদের মেঝেতে টাইলস বসানো হয়েছে এবং সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌস আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাচীনকালে জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায়। তবে কে বা কারা এটি নির্মাণ করেছেন, কিংবা ঠিক কোন সময়ে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য স্থানীয়দের কাছে নেই।

ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৩২৫ থেকে ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মসজিদসংলগ্ন এলাকা সুবা বাংলার বিহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই সময়ের সুবেদার ইব্রাহিম খাঁন মাজার মসজিদটি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণকৌশল বিবেচনায় অনেকে এটিকে মোগল আমলের স্থাপনা বলে ধারণা করেন। সেই ধারণা সত্য হলে মসজিদটির বয়স প্রায় ৪০০ বছর হতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে প্রয়োজন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও ঐতিহাসিক গবেষণা।

স্থানীয়দের কেউ কেউ মসজিদটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মসজিদ বলেও দাবি করেন। তবে এ দাবির পক্ষে এখনো কোনো স্বীকৃত গবেষণা বা প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। মসজিদটির ঐতিহাসিক পরিচয় ও নির্মাণকাল নিয়েও সরকারি বা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা হয়নি।

গোয়াইনঘাট সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানী সুমন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁরা মসজিদটি দেখে আসছেন। তবে এর সঠিক ইতিহাস জানতে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা করা প্রয়োজন। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থাপনাটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে।

প্রাচীন স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হয়েও দীর্ঘদিন ধরে অজানা ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে ‘এক ডিমের মসজিদ’। প্রয়োজনীয় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি শুধু গোয়াইনঘাট নয়, সারা দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *