শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ইলেকশন ল্যাবের উদ্যোগে আয়োজিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার, চ্যালেঞ্জ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিয়ে ‘The Contours of Bangladesh’s Foreign Policy: Priorities, Challenges, & Strategic Autonomy’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের ৫০৪ নম্বর কক্ষে আয়োজিত এ সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (BEI) প্রেসিডেন্ট ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির। অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ, পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও দূরদর্শী, বাস্তবভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তুলতে হবে। প্রচলিত কূটনৈতিক চর্চার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে আগামী ৫০ বছরের বৈশ্বিক পরিবর্তন ও সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও জনসংখ্যার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়েও একটি ভিন্নধর্মী প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, সীমিত ভূখণ্ডের বিপরীতে বিপুল জনসংখ্যার বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি বৃহত্তর অংশের বিদেশে অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি আয়ারল্যান্ডের জনগোষ্ঠী এবং ইহুদি জনগোষ্ঠীর উদাহরণ দেন, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ নিজ নিজ দেশের বাইরে বসবাস করে। তিনি মনে করেন, প্রবাসী জনগোষ্ঠী শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জ্ঞান, দক্ষতা এবং কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও আলোচনা করেন তিনি। এ সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) কাঠামোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে। জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তিনি ভৌত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত ও মিয়ানমারের প্রসঙ্গও আলোচনায় উঠে আসে। তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে কার্যকর যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।

পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy) বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো একক বৈশ্বিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে জাতীয় স্বার্থ, বাস্তবতা ও কূটনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (Non-Aligned Movement) ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য বিবেচনায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে ডিজিটাল কূটনীতি (Digital Diplomacy), জনকূটনীতি (Public Diplomacy) এবং জ্ঞানভিত্তিক কূটনীতির (Knowledge Diplomacy) ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কার্যকর ব্যবহার এবং জ্ঞান ও তথ্যকে কূটনৈতিক সক্ষমতায় রূপান্তরের মাধ্যমে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব বলে তিনি মত দেন।

বক্তব্যের সামগ্রিক আলোচনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় প্রচলিত কূটনৈতিক পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল ও জ্ঞাননির্ভর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *