নিজাম উদ্দীন সালেহ
কানাডা সরকার গতকাল (৫ নভেম্বর) তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘২০২৭–২০২৯ ইমিগ্রেশন লেভেল প্ল্যান’ ঘোষণা করেছে। বাজেট ২০২৬-এর অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন এবং অভিবাসন মন্ত্রী লেনা মেটলেজ ডিয়াব যৌথভাবে এই নতুন অভিবাসন পরিকল্পনাটি পার্লামেন্টে উপস্থাপন করেন। পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় এবার অভিবাসন নীতিতে বড় কোনো লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি না করে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে. মূলত দেশের আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক অবকাঠামোর ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখাই এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য।
স্থির লক্ষ্যমাত্রা ও মূল সংখ্যাসমূহ:
নতুন এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, কানাডা ২০২৭, ২০২৮ এবং ২০২৯ সালের প্রতিটি বছরে ৩,৮০,০০০ জন স্থায়ী বাসিন্দা (Permanent Resident বা PR) গ্রহণ করবে। একই সাথে, প্রতি বছর ৩,৭০,০০০ জন নতুন অস্থায়ী বাসিন্দা (Temporary Resident) যেমন—আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও বিদেশি কর্মীদের আগমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে. পূর্ববর্তী বছরের প্রক্ষেপণের সাথে মিল রেখে এই সংখ্যাগুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, তবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই ধারাটি প্রসারিত করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০২৭ সালের শেষের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে অস্থায়ী বাসিন্দার হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা।
অর্থনৈতিক অভিবাসনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
কানাডার শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক অভিবাসন শ্রেণীকে (Economic Class) সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা মোট স্থায়ী বাসিন্দা বরাদ্দের ৬৪.৪ শতাংশ। এর আওতায় এক্সপ্রেস এন্ট্রি ও প্রোভিন্সিয়াল নমিনি প্রোগ্রামের (PNP) মাধ্যমে দক্ষ কর্মী নির্বাচন করা হবে. এর বাইরে, পারিবারিক পুনর্মিলন (Family Reunification) ক্যাটাগরিতে ২১.৩ শতাংশ এবং শরণার্থী ও মানবিক ক্যাটাগরিতে ১৩ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফ্রেঞ্চভাষী অভিবাসীদের জন্য কোটা বাড়িয়ে ২০২৭ সালে ৯.৫%, ২০২৮ সালে ১০.৫% এবং ২০২৯ সালের মধ্যে ১২% করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ অস্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য বড় সুযোগ
এই লেভেল প্ল্যানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো কানাডায় ইতিমধ্যে বসবাসরত অস্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগের ঘোষণা. সরকারের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপের আওতায় ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ২,০০,০০০ অস্থায়ী বাসিন্দাকে স্থায়ী বাসিন্দা (PR) হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে অর্ধেক (১,০০,০০০) সুযোগ পাবেন এক্সপ্রেস এন্ট্রি ও পিএনপি-র যোগ্য কর্মীরা এবং বাকি অর্ধেক বরাদ্দ থাকবে মানবিক ও অন্যান্য বিশেষ স্ট্রিমের আওতায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য। এই সিদ্ধান্তের ফলে নতুন করে বাইরে থেকে লোক না এনে দেশেই অবস্থানরত দক্ষ জনশক্তিকে স্থায়ী করার মাধ্যমে আবাসন খাতের ওপর বাড়তি চাপ এড়ানো সম্ভব হবে।
বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন কৌশল
ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (IRCC) যাতে এই নতুন পরিকল্পনাটি সুচারুভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, সে জন্য ২০২৭ সাল থেকে পরবর্তী চার বছরের জন্য ৫৬.৯ মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অস্থায়ী বাসিন্দাদের পিআর-এ রূপান্তরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আরও ৩০২.৩ মিলিয়ন ডলারের তহবিল নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি টেম্পোরারি ফরেন ওয়ার্কার প্রোগ্রামে (TFWP) সংস্কার আনার জন্য পাঁচ বছরে ১৫১.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে, যার মাধ্যমে স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে বিদেশি কর্মীদের কাজের আরও ভালো সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
পরিশেষে বলা যায়, কানাডার এই নতুন ইমিগ্রেশন লেভেল প্ল্যানটি দেশটির অভিবাসন ইতিহাসে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ. এটি একদিকে যেমন বিদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের আগমনকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনবে, অন্যদিকে কানাডার ভেতরে থাকা দক্ষ অভিবাসীদের স্থায়ী নাগরিকত্বের পথ সুগম করে দেশটির অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখবে।
