নিজাম উদ্দিন সালেহ :
‘অনেক সন্ধান ক’রে নীতি নয়, প্রেম নয়, সার্থকতা নয়,/ পেয়েছি আহত ক্লান্তি … ক্লান্তি, ক্লান্তি শুধু।’ কবিতাংশটি বিনয় মজুমদারের।
১৭ সেপ্টেম্বর ছিলো এই ক্ষ্যাপাটে কবি ও ইঞ্জিনিয়ারের জন্মদিন। লেখক সৈকত আমীন লিখেছেন,
মশারীর ভেতরে শুয়ে বিড়ি খেতে খেতে হঠাৎ দেশলাই দিয়ে মশারীতেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন বিনয় মজুমদার। আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ঘরে।
সেই আগুনের বিষয়ে বিনয় প্রায়ই বলতেন, তিনি হাঙরের অত্যাচার আর সহ্য করতে পারছিলেন না।
বিনয় আটবার মানসিক হাসপাতালে গেছেন। ৩০ বারের বেশি তাঁর মাথায় দেওয়া হয়েছে ইলেকট্রিক শক। এরপরেও বিনয় বলেছেন, ‘এতোকিছুর পরেও আমি সুস্থ চিন্তা করতে পারি। নিজেকে পাগল বলে মনে করি না। তাই কেউ পাগল বললে আমার খারাপ লাগে।’
মানসিক হাসপাতালে থাকা যে তাঁর জন্য খুব সুখের ছিলো না, তা একটি চিঠি থেকে ভালো বোঝা যায়। চিঠিটা তিনি লিখছিলেন হাসপাতালে বসে, মহকুমা শাসককে। তাতে উল্লেখ করছেন, বাড়ির লোকেরা না চাইলেও তিনি এখন বাড়ি ফিরতে চান।
আর যখন সত্যিই বাড়ি ফিরতে পেরেছেন, দেখেছেন- আত্মীয়দের থেকে মানসিক রোগীর প্রয়োজনীয় সহানুভূতিও তিনি পাচ্ছেন না।
এই কারণেই এক সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশ ছাড়বেন। ধর্ম ছাড়বেন। ইসলাম ধর্ম নেবেন। পালিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশে, পাসপোর্ট ছাড়াই।
বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। তারপর হঠাৎ কী মনে হলো, নিজেই গিয়ে থানায় হাজির হলেন। যেচে গিয়ে বললেন, আমার পাসপোর্ট-ভিসা কিছুই নেই, কিন্তু আমি এদেশের নাগরিক হতে চাই। এতে তাকে আটক করে হাজতে ভরা হলো। পরে অবশ্য বনগাঁ সীমান্তে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিনয় বলেন- এই তার জীবনে আরেক সর্বনাশ। থানায় নির্যাতন করে তার বাম চোখ আর বাম কান নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল বিনয়ের।
বিনয় বলছেন, টাকার অভাব আমার বিয়ে না করার কারণ। সারাদিন টাকার চিন্তায় আমার সময় কাটে। অর্থের অভাবেই আমার জীবন মরুভূমি হয়ে গেলো।
অথচ আজীবন অর্থাভাবে থাকা এই কবি তারুণ্যেই পেয়েছিলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় আর লন্ডন থেকে গণিতের অধ্যাপনার ডাক। জাপান থেকে মোটা বেতনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য ডাক। কিন্তু তিনি যাননি। এমন অজস্র চাকরির সুযোগ তিনি বারবার ছেড়েছেন। কারণ ২৬ বছর বয়সে তিনি ঠিক করেছিলেন, তিনি শুধু কবিতাই লিখবেন।
শেষ বয়সে মানুষ সম্পর্কে সন্দেহ এসেছিল বিনয়ের মনে। সহজে তাঁর সঙ্গে মেশা যেত না।
কাঁপা হাতে নিজেই নিজের ঘরের তালা খুলতেন, কেউ সাহায্য করতে এলে তা নিতেন না।
শেষে মিডিয়ার মানুষদের দেখলে লাঠি নিয়ে তাড়া করতেন। মাঝে মধ্যে ঘরে নিজেকে বন্দি করে রাখতেন আর কেউ ডাকলে বলতেন, ‘আমি আমার অন্ধকার মায়ের কোলে ন্যাংটো হয়ে শুয়ে আছি, দরজা খুলব না’।
এমন সময় রেডিও আকাশবাণী থেকে ঠিক করা হলো বিনয়কে কবিতা পড়তে নিয়ে আসা হবে। বিনয় তো তখন তীব্র মিডিয়াবিমুখ। তাই রেডিও আকাশবাণীর চিহ্ন আড়াল করে একটি গাড়ি পাঠানো হলো বিনয়কে আনতে। ঠাকুরনগর থেকে তাকে কলকাতায় আনা হলো চোখের ডাক্তার দেখানোর নাম করে। কিন্তু আকাশবাণীর গেট দেখেই ভয়ঙ্কর রেগে গেলেন বিনয়। কিছুতেই তাকে নিয়ে যাওয়া যায় না।
সেসময় যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা বিনয়কে অনেক বুঝিয়ে কৌশলে নিয়ে গেলেন রেকর্ডিংয়ের ঘরে। সেখানে বিনয় চলে এলেন স্বমহিমায়। এতোক্ষণের যা বিরোধ, সব তাঁর কেটে গেলো কবিতার পাঠে।
শুধু কবিতা পড়তে পড়তে মাঝে বলে উঠলেন, খিদে পেয়েছে। আমি এখন খাব। ক্যান্টিন থেকে খাবার আনানো হলো। বিনয় খাবার খেলেন।
বিনয়কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আবার যদি কবিতা পড়তে ডাকা হয় উনি আসবেন কিনা?
উত্তরে বিনয় বলছেন, যদি এভাবে ভাত খেতে দাও আবার আসব কবিতা পড়তে। মশারীর ভেতরে শুয়ে বিড়ি খেতে খেতে হঠাৎ দেশলাই দিয়ে মশারীতেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন বিনয় মজুমদার। আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ঘরে।
সেই আগুনের বিষয়ে বিনয় প্রায়ই বলতেন, তিনি হাঙরের অত্যাচার আর সহ্য করতে পারছিলেন না।
বিনয় আটবার মানসিক হাসপাতালে গেছেন। ৩০ বারের বেশি তাঁর মাথায় দেওয়া হয়েছে ইলেকট্রিক শক। এরপরেও বিনয় বলেছেন, ‘এতোকিছুর পরেও আমি সুস্থ চিন্তা করতে পারি। নিজেকে পাগল বলে মনে করি না। তাই কেউ পাগল বললে আমার খারাপ লাগে।’
মানসিক হাসপাতালে থাকা যে তাঁর জন্য খুব সুখের ছিলো না, তা একটি চিঠি থেকে ভালো বোঝা যায়। চিঠিটা তিনি লিখছিলেন হাসপাতালে বসে, মহকুমা শাসককে। তাতে উল্লেখ করছেন, বাড়ির লোকেরা না চাইলেও তিনি এখন বাড়ি ফিরতে চান।
আর যখন সত্যিই বাড়ি ফিরতে পেরেছেন, দেখেছেন- আত্মীয়দের থেকে মানসিক রোগীর প্রয়োজনীয় সহানুভূতিও তিনি পাচ্ছেন না।
এই কারণেই এক সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশ ছাড়বেন। ধর্ম ছাড়বেন। ইসলাম ধর্ম নেবেন। পালিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশে, পাসপোর্ট ছাড়াই।
বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। তারপর হঠাৎ কী মনে হলো, নিজেই গিয়ে থানায় হাজির হলেন। যেচে গিয়ে বললেন, আমার পাসপোর্ট-ভিসা কিছুই নেই, কিন্তু আমি এদেশের নাগরিক হতে চাই। এতে তাকে আটক করে হাজতে ভরা হলো। পরে অবশ্য বনগাঁ সীমান্তে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিনয় বলেন- এই তার জীবনে আরেক সর্বনাশ। থানায় নির্যাতন করে তার বাম চোখ আর বাম কান নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল বিনয়ের।
বিনয় বলছেন, টাকার অভাব আমার বিয়ে না করার কারণ। সারাদিন টাকার চিন্তায় আমার সময় কাটে। অর্থের অভাবেই আমার জীবন মরুভূমি হয়ে গেলো।
অথচ আজীবন অর্থাভাবে থাকা এই কবি তারুণ্যেই পেয়েছিলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় আর লন্ডন থেকে গণিতের অধ্যাপনার ডাক। জাপান থেকে মোটা বেতনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য ডাক। কিন্তু তিনি যাননি। এমন অজস্র চাকরির সুযোগ তিনি বারবার ছেড়েছেন। কারণ ২৬ বছর বয়সে তিনি ঠিক করেছিলেন, তিনি শুধু কবিতাই লিখবেন।
শেষ বয়সে মানুষ সম্পর্কে সন্দেহ এসেছিল বিনয়ের মনে। সহজে তাঁর সঙ্গে মেশা যেত না।
কাঁপা হাতে নিজেই নিজের ঘরের তালা খুলতেন, কেউ সাহায্য করতে এলে তা নিতেন না।
শেষে মিডিয়ার মানুষদের দেখলে লাঠি নিয়ে তাড়া করতেন। মাঝে মধ্যে ঘরে নিজেকে বন্দি করে রাখতেন আর কেউ ডাকলে বলতেন, ‘আমি আমার অন্ধকার মায়ের কোলে ন্যাংটো হয়ে শুয়ে আছি, দরজা খুলব না’।
এমন সময় রেডিও আকাশবাণী থেকে ঠিক করা হলো বিনয়কে কবিতা পড়তে নিয়ে আসা হবে। বিনয় তো তখন তীব্র মিডিয়াবিমুখ। তাই রেডিও আকাশবাণীর চিহ্ন আড়াল করে একটি গাড়ি পাঠানো হলো বিনয়কে আনতে। ঠাকুরনগর থেকে তাকে কলকাতায় আনা হলো চোখের ডাক্তার দেখানোর নাম করে। কিন্তু আকাশবাণীর গেট দেখেই ভয়ঙ্কর রেগে গেলেন বিনয়। কিছুতেই তাকে নিয়ে যাওয়া যায় না।
সেসময় যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা বিনয়কে অনেক বুঝিয়ে কৌশলে নিয়ে গেলেন রেকর্ডিংয়ের ঘরে। সেখানে বিনয় চলে এলেন স্বমহিমায়। এতোক্ষণের যা বিরোধ, সব তাঁর কেটে গেলো কবিতার পাঠে।
শুধু কবিতা পড়তে পড়তে মাঝে বলে উঠলেন, খিদে পেয়েছে। আমি এখন খাব। ক্যান্টিন থেকে খাবার আনানো হলো। বিনয় খাবার খেলেন।
বিনয়কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আবার যদি কবিতা পড়তে ডাকা হয় উনি আসবেন কিনা?
উত্তরে বিনয় বলছেন, যদি এভাবে ভাত খেতে দাও আবার আসব কবিতা পড়তে।
উল্লেখ্য, ১৯৪২ সালে তাকে বাংলাদেশের একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়। ১৯৪৪ সালে তিনি প্রথম বিভাগে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৪৬ সালে তাকে বৌলতলী উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। ১৯৪৮ সালে দেশভাগের সময় তারা সপরিবারে ভারতের কলকাতায় চলে আসেন। এখানে, ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে ক্রিক রো-রতে অবস্থিত মেট্রপলিটন ইনস্টিটিউট (বউবাজার ব্রাঞ্চ)-এ নবম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হবার পরে, ১৯৫১ সালে আইএসসি (গণিত) পড়ার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৭ সালে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে পাশ করেন। শোনা যায়, তার পাওয়া নম্বর আজও কেউ নাকি ভাঙতে পারেন নি। ১৯৫৭ সালে শিবপুর বি.ই.কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে, অর্থাৎ ছাত্রজীবন সমাপ্ত হবার কয়েকমাস পরেই এনবিএ থেকে প্রকাশিত হয় “অতীতের পৃথিবী” নামক একটি অনুবাদ গ্রন্থ। এই বছরেই গ্রন্থজগৎ থেকে বের হয় তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘নক্ষত্রের আলোয়’। ১৯৫৩-৫৭ সাল পর্যন্ত রুশ ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করে কিছু রুশ সাহিত্য বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন।



