রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তর, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সৌজন্যে
রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত, সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের জন্য পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন তিনি।
বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে।
তিনি বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে দেশে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে এখনো নতুন করে মানুষ পালিয়ে আসছে।
তারেক রহমান বলেন, প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি প্রজন্ম। রোহিঙ্গা মায়েরা সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং প্রবীণরা নিজভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্যও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তবে শিবিরগুলো দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের জন্য আদর্শ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ ক্রমেই বাড়ছে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও এর বড় ধরনের প্রভাব বহন করতে হচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। অনেক রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। একটি দেশে অমীমাংসিত থাকা এ সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজন বাড়লেও মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
তিনি বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন বেশি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। অনির্দিষ্টকালের জন্য শুধু বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের দায়ভার বহন করবে, এটিও প্রত্যাশিত নয়। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও নিরাপত্তাহীনতার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন শুধু সহমর্মিতা দেখানোর সময় নয়। সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
সূত্র : বাসস



