জাতিসংঘে ড. খলিলুর রহমান : বাংলাদেশীর বুকে এক অন্যরকম স্পন্দন

জাতিসংঘে ড. খলিলুর রহমান : বাংলাদেশীর বুকে এক অন্যরকম স্পন্দন

দৃশ্যটা এমন। জাতিসংঘের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হল। যে হলে বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বনেতারা শপথ নিয়েছিল আর যুদ্ধ নয়, সেই হলেই দাঁড়িয়ে আছেন একজন বাংলাদেশি। হাতে আইসল্যান্ডের সেই কাঠের হাতুড়ি, যেটা ৮০ বছর ধরে এক সভাপতি থেকে আরেক সভাপতির হাতে যায়। বিদায়ী সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক সেই হাতুড়ি তুলে দিলেন ড. খলিলুর রহমানের হাতে।

এই দৃশ্যটা শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা নয়। এই দৃশ্যটা আমাদের জন্য ইতিহাস। ৪০ বছর আগে ঠিক এই একই মঞ্চে, এই একই হলে, একজন তরুণ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন খলিলুর রহমান। তার সামনে ছিলেন তৎকালীন সাধারণ পরিষদের সভাপতি হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, বাংলাদেশের আরেক কিংবদন্তি। সেদিন তিনি ছিলেন প্রাইভেট সেক্রেটারি, নোট নিচ্ছিলেন। আর আজ ৪০ বছর পর, সেই একই মঞ্চে তিনি সভাপতি। এই গল্পটা কোনো সিনেমার গল্প নয়, এই গল্পটা বাংলাদেশের। একটি ছোট, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে উঠে এসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চের সভাপতিত্ব করার গল্প।

তার সূচনা ভাষণে তিনি একটা লাইন বললেন, যা শুনে যে কেউ উদ্বুদ্ধ হতে পারে। তিনি বললেন, “এটা ১৯৪৫ সাল নয়। এটা ৮১তম অধিবেশন। পৃথিবী এগিয়ে গেছে। জাতিসংঘকেও এগোতে হবে।”

কথাটা সহজ, কিন্তু ভেতরে আগুন আছে। ১৯৪৫ সালে যখন জাতিসংঘ তৈরি হয়েছিল, তখন সদস্য ছিল ৫০ টি দেশ। আজ ১৯৩ টি দেশ। তখন বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, হলোকাস্টের রক্তের দাগ। আর আজ যুদ্ধ অন্য রকম, সংকট অন্য রকম। আজ গাজায় শিশুরা মরছে, সুদানে দুর্ভিক্ষ, ইউক্রেনে বোমা, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বলছে, কক্সবাজারে ১৩ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে পড়ে আছে। জাতিসংঘ কি এগুলো থামাতে পারছে? পারছে না। তাই মানুষের আস্থা কমে গেছে। ড. খলিলুর রহমান সেই আস্থার কথাই বললেন। তিনি বললেন, আমাদের জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলতেই হবে। এটা এমন একটা জায়গা হতে হবে যেখানে দেশগুলো আবার আত্মবিশ্বাস ও উৎসাহ নিয়ে বলতে পারবে এবং ভোট দিতে পারবে ‘হ্যাঁ জাতিসংঘকে’।

তিনি তার অধিবেশনের থিম ঠিক করেছেন – “আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ।” এটা শুধু একটা স্লোগান নয়, এটা একটা অভিযোগপত্র। বিশ্বের বিরুদ্ধে, ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে।

ভাষণে তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন, যা আগে কোনো সভাপতি এত স্পষ্ট করে বলেননি। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের কথা বলেছেন। বলেছেন, জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক গোষ্ঠী আফ্রিকা, যারা সবচেয়ে বেশি শান্তিরক্ষী পাঠায়, তাদের নিরাপত্তা পরিষদে একটিও স্থায়ী আসন নেই। এটা কি ন্যায়বিচার? তিনি বললেন, আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের দাবি কোনো করুণা নয়, এটা ন্যায়বিচার, এটা জাতিসংঘের নিজের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন।
একজন বাংলাদেশি দাঁড়িয়ে আফ্রিকার জন্য কথা বলছে, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের চোখে চোখ রেখে বলছে, তোমরা অগণতান্ত্রিক। এই সাহস কোথা থেকে আসে? এই সাহস আসে বাংলাদেশ থেকে। কারণ আমরা জানি বৈষম্য কী। আমরা ১৯৭১ সালে বৈষম্যের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছি।

তিনি আরও একটি নির্মম সত্য তুলে ধরলেন। তিনি বললেন, যখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য, এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি থমকে আছে, তখন ধনী ওইসিডি দেশগুলো তাদের উন্নয়ন সহায়তা এক বছরে ২৩% কমিয়ে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে এনেছে। আর একই সময়ে বিশ্বের সামরিক ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, মানুষকে বাঁচানোর টাকা কমছে, মানুষকে মারার টাকা বাড়ছে। এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে? একজন বাংলাদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যার দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার, তার মুখ থেকে এই কথাটা যখন আসে, তখন সেটা শুধু পরিসংখ্যান থাকে না, সেটা হয়ে যায় আর্তনাদ।

আর রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ। তিনি বললেন, আমি এমন এক জনগোষ্ঠীকে দেখেছি যাদের ঘরবাড়ি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমি তাদের সহনশীলতাও দেখেছি, তাদের ঘরে ফেরার আকুতিও দেখেছি। তিনি জাতিসংঘকে মনে করিয়ে দিলেন, কক্সবাজারে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা এখনো পড়ে আছে, এটা কোনো পরিসংখ্যান নয়, এটা একটি মানবিক সংকট। এবং তিনি বললেন, সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান দেবে না, শুধু আলোচনাই পারে সমাধান দিতে।

এই ভাষণের প্রতিটি শব্দে বাংলাদেশ ছিল। যখন তিনি বলছিলেন, জাতিসংঘের সনদের শুরুতেই লেখা আছে “আমরা, জাতিসংঘের জনগণ” – তখন মনে হচ্ছিল তিনি শুধু জাতিসংঘের কথা বলছেন না, তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের কথাও বলছেন। যখন তিনি বলছিলেন, সুশীল সমাজ, বিজ্ঞানী, তরুণদের কণ্ঠস্বরকে জাতিসংঘে আনতে হবে, তখন মনে হচ্ছিল তিনি সিলেটের, ঢাকার, চট্টগ্রামের তরুণদের কথা বলছেন, যারা বিশ্বাস করে পৃথিবী বদলানো যায়।

এই ভাষণ কেন আবেগের? কারণ ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দ্বিতীয়বারের মতো একজন বাংলাদেশি এই চেয়ারে বসেছে। ৪০ বছর পর। ৪০ বছর আগে বাংলাদেশ ছিল সাহায্য চাওয়া দেশ, আজ বাংলাদেশ শান্তিরক্ষায় সবচেয়ে বেশি সেনা পাঠানো দেশ। ৪০ বছর আগে বাংলাদেশকে চিনত না, আজ বাংলাদেশের প্রার্থী ৯৯ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়, সাইপ্রাসের প্রার্থীকে ৮ ভোটে হারিয়ে।

ড. খলিলুর রহমান তার বক্তব্য শেষ করলেন একটা আশা নিয়ে। তিনি বললেন, আমি এতটা নির্বোধ নই যে ভাবব সব সমস্যা দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। কিছু সমস্যা থাকবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা চেষ্টা করব না। যেখানে মিল আছে, সেখানে আমরা একসাথে কাজ করব।

এই কথাটাই তো বাংলাদেশ। আমরা জানি সব সমস্যা সমাধান হবে না। কিন্তু আমরা হাল ছাড়ি না। আমরা ১৯৭১ সালেও হাল ছাড়িনি, ২০২৪ সালেও ছাড়িনি।

জাতিসংঘের মঞ্চে আজ একজন বাংলাদেশি দাঁড়িয়ে বলছে, বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। আর আমরা সিলেটে, ঢাকায় বসে টিভিতে দেখছি, আর আমাদের বুকটা গর্বে ভরে যাচ্ছে। কারণ এই মানুষটা আমাদের। তার পাসপোর্ট বাংলাদেশের। তার রক্তে বাংলাদেশ।

এই ভাষণ তাই শুধু একটি উদ্বোধনী ভাষণ নয়, এটি একটি দেশের ফিরে আসার ঘোষণা। বিশ্বকে জানান দেওয়া, আমরা আছি, আমরা ছিলাম, আমরা থাকব। এবং আমরা শুধু সাহায্য নিতে আসিনি, আমরা নেতৃত্ব দিতে এসেছি।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৮
  • ১১:৪৮
  • ৪:০৬
  • ৫:৫১
  • ৭:০৪
  • ৫:৪১