বিশ্বের প্রথম কবিতা: ঈশ্বরকে খোঁজার আকুতি

 

বিশ্বের প্রথম কবিতাটি লেখা হয়েছিলো মাটির ফলকে। আর বাংলার প্রথম কবিতাটি লেখা হয়েছিল তালপাতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারে। মাঝখানে ৩ হাজার বছরের ব্যবধান। কিন্তু আশ্চর্য মিল, দুটো কবিতাই লেখা হয়েছিল ঈশ্বরকে খুঁজতে গিয়ে, আর শেষ পর্যন্ত মানুষকেই খুঁজে পাওয়ার গল্পে।

খ্রিস্টপূর্ব ২৩০০ সাল। আজকের ইরাকের উর নগরী। চন্দ্রদেবতার মন্দিরে এক নারী বসে আছেন। নাম এনহেদুয়ান্না। তিনি রাজকন্যা, তিনি প্রধান পুরোহিত, কিন্তু আজ তিনি নির্বাসিত। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে তাঁকে মন্দির থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তখন তিনি মাটির নরম ফলকে কীলক লিপিতে লিখলেন:“আমি, এনহেদুয়ান্না, নান্নার পুরোহিত/আমার হৃদয় আজ ছিন্নভিন্ন…”

এটি ছিল বিশ্বের প্রথম কবিতা: ‘ইনান্নার প্রতি স্তুতি’। ১৫৩ পঙক্তির এক আর্তনাদ। দেবীর কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি। ইতিহাসে প্রথমবার কোনো মানুষ নিজের নাম লিখে বলল, “এটা আমার কষ্ট, এটা আমার লেখা।”
তিনি শুধু দেবীকে ডাকেননি, তিনি নিজের অস্তিত্বকে ঘোষণা করেছিলেন।

এবার ৩০০০ বছর পর চলে আসুন। দশম শতাব্দী। বাংলার কোনো এক বৌদ্ধ বিহারে।

বাইরে পাল রাজাদের শাসন, ভেতরে এক সাধক ধ্যানে বসে আছেন। নাম লুইপাদ। তিনি মাছের অন্ত্র পরিষ্কার করতেন বলে তাঁকে বলা হতো লুইপা। সমাজের চোখে তিনি নিচু জাতের, অস্পৃশ্য। কিন্তু তাঁর ভেতরে তখন অন্য আগুন।

তিনি লিখলেন বাংলার প্রথম কবিতা, চর্যাপদের প্রথম পদ:
“কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥”
এর অর্থ: শরীরটা যেন একটা গাছ, তার পাঁচটা ডাল। চঞ্চল মনে কাল প্রবেশ করে।

কী গভীর! এনহেদুয়ান্না যেমন রাজপ্রাসাদ থেকে নির্বাসিত হয়ে ঈশ্বরকে খুঁজেছিলেন, লুইপা তেমনি সমাজ থেকে নির্বাসিত হয়ে নিজের শরীরের ভেতরেই ঈশ্বরকে খুঁজেছিলেন। দুজনেই নির্বাসিত, দুজনেই সাধক।
এনহেদুয়ান্না লিখেছিলেন সুমেরীয় ভাষায়, যা আজ মৃত। লুইপা লিখেছিলেন সান্ধ্য ভাষায়, যা আজকের বাংলার আদি রূপ। একজন লিখেছিলেন রাজকীয় মন্দিরে বসে, আরেকজন লিখেছিলেন শ্মশানে বসে। কিন্তু দুজনের কবিতার ভেতরে একটাই প্রশ্ন: আমি কে? এই শরীর, এই মন, এই দুঃখ, এর শেষ কোথায়?

এনহেদুয়ান্নার কবিতা উদ্ধার হয়েছে মাটি খুঁড়ে, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা আছে। আর লুইপার কবিতা উদ্ধার হয়েছে নেপালের রাজদরবারের ধুলো জমা পুঁথি থেকে, ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী খুঁজে এনেছিলেন। দুটো কবিতাই হারিয়ে গিয়েছিল, আবার ফিরে এসেছে। যেন কবিতা কখনো মরে না।

৪৩০০ বছর আগে একজন নারী কাঁদতে কাঁদতে প্রথম কবিতা লিখেছিলেন, আর ১১০০ বছর আগে বাংলার এক অন্ত্যজ মানুষ নিজের শরীরকে গাছ ভেবে প্রথম বাংলা কবিতা লিখেছিলেন।

তাদের দুজনের কেউই কবি হতে চাননি। তারা শুধু বাঁচতে চেয়েছিলেন। আর বাঁচার আর্তনাদ থেকেই জন্ম নিয়েছিল কবিতা। তাই কবিতা কোনো বইয়ের জিনিস নয়। কবিতা হলো মানুষের প্রথম কান্না, আর শেষ প্রার্থনা।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৮
  • ১১:৪৮
  • ৪:০৬
  • ৫:৫১
  • ৭:০৪
  • ৫:৪১