অপেক্ষা ও প্রস্তুতির শেষে প্রকৃতির নিয়মে আসে আমার আমেরিকা যাত্রার শুভক্ষণ ১ অক্টোবর ২০২৬। আমার প্রথম আমেরিকা সফরে পুরো পরিবার সদস্যরা উচ্ছসিত। আমাকে প্লেনে তুলে দিতে ছিলো তাঁদের নিরব প্রস্তুতি। বড় মেয়ে আর্কিটেক্ট বুশরা তার নির্মানিক আর্কিটেক্ট প্রতিষ্ঠান থেকে আগেই ছুটি নিয়ে নেয়, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছোট ছেলে ক্লাস শেষ করে দ্রুত বাসায় চলে আসে। ছোট মেয়ে সায়িমা এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় হোস্টেলেই আছে, একদিন আগে বাসায় এসে বিদায় জানিয়ে যায়। বড় ছেলে সামিন ইউনিভার্সিটিতে যাবার সময় বিদায় জানিয়ে যায়। সকালে আমি সময়মতো অফিসে যাই, উর্ধতন কর্মকর্তাদের (নির্বাহী পরিচালক খালেদ আহমদ, পরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান ও আব্দুস সালাম মাহমুদ) সাথে দেখা করে বিদায় নেই, সহকর্মী অনেকে আমার অফিস কক্ষে এসে শুভাশিস জানান। বাসা থেকে ফোন করে জানানো হয় তাঁরা বিদায় দিতে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক নওশাদ মোস্তাফা’র সাথে দেখা করতে গেলে জানান বিকালের একই ফ্লাইটে তিনিও ঢাকা যাবেন। আমরা সিদ্ধান্ত নেই অফিসের একই গাড়িতে বিমানবন্দর যাব। আমার সিলেটের খারপাড়ার বাসায় সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলমান থাকায় গাড়ি এখন পার্কিং স্পেসে বন্ধ রয়েছে। দুপুরে খাবার দাবারের পর আমরা প্রস্তুত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আসি। নির্বাহী পরিচালক খালেদ আহমদ স্যারের সাথে দেখা করি, তিনি আমার পরিবার সদস্যদের স্বাগত জানান এবং কফি পানে আপ্যায়ন করান, অতিরিক্ত পরিচালক সহপাঠী বন্ধু সুব্রত দত্ত এসে আমাকে বিদায় জানান।
আমার আমেরিকা সফর উপলক্ষে হলুদ দলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টা মোঃ সাইফুল আলম, সভাপতি ধরনী কান্ত দাশ ও সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান মোঃ ফাহিম মিয়ার নেতৃত্বে দলের নেতারা ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। সবুজ দলের সভাপতি একেএম আক্তার ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবুল কাশেম, নীল দলের সভাপতি কবির আহমদ শরীফ দেখা করে শুভ বিদায় জানান।
যানজটের ভয়ে বিকল্প রাস্তায় পরিচালক নওশাদ মোস্তাফা স্যারকে নিয়ে আমরা সময়ের কিছুটা আগেই ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌছে যাই। ফটোসেশন করে পরিবার সদস্যদের শুভ বিদায় জানিয়ে আমরা দু’জন বোর্ডিং নিয়ে ভিআইপি লাউঞ্জে বিশ্রাম নেই। দু রাকাআত কসর নামাজ আদায় করি। ফ্লাইটে আরোহনের কিছুটা আগে আমরা এমট়িবি’র লাউঞ্জে ঢুকে স্ন্যাকস খাই ও কফি পান করি। বাসার লোকজন গাড়িচালক সবুজ দাস’কে নিয়ে বিমানবন্দরের পাশ্ববর্তী বাইশটিলায় ঢু মেরে ফিরে যান নীড়ে। সিলেটে প্রবাসীর দেশে আসা যাওয়ার সময় নিকটাত্মীয়রা বিমানবন্দরে দলবেঁধে আসার প্রথা অনেক দিনের পুরনো রীতি। সৌখিন পর্যটককে বিদায় জানাতে সে রীতিরই প্রতিফলন হয়ে গেল।
নভোএয়ারের ফ্লাইট যথাসময়ে ঢাকা পৌঁছে, সফরের বিষয়ে মূল্যবান টিপস ও শুভকামনা জানিয়ে বিদায় নেন নওশাদ স্যার। বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর তাঁর বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফোনে কথা হয় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা একেএম গোলাম বহলুল, মোঃ জহুরুল হক, সালাউদ্দিন তাপাদার, আজহারুল ইসলাম’র সাথে। নিউইয়র্ক থেকে ফোন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ইকবাল মাহমুদ। ডমেস্টিক টার্মিনাল থেকে মালামাল ট্রলিতে রেম দিয়ে ইন্ট্রারন্যশনাল টার্মিনালে গিয়ে অপেক্ষমান থাকি। ব্যাগেজ রেপিং করে নিউইয়র্কের এড্রেস লিখে মাসকিন টেপ দিয়ে লাগেজে লাগিয়ে প্রস্তুতি শেষ করি। আসর, মাগরিব, এশার নামাজ বিমানবন্দরে পড়ি।
বিকাল পাঁচটা থেকেই ইত্তেহাদ এয়ারলাইনসের বোর্ডিং শুরু হয়ে যায়। বোর্ডিং ও ইমিগ্রেশন শেষ করে সন্ধ্যার আগেই বোর্ডিং এরিয়ায় ঢুকে যাই। ইমিগ্রেশন অফিসার বাংলাদেশ ব্যাংকের ছুটির সরকারি আদেশ (জিও) অনলাইনে পরীক্ষা করে বিশেষ লাইনে দ্রুত ইমিগ্রেশন করে দেন। ইমিগ্রেশন শেষে তাঁকে আমি পুলিশ পরিবারের সদস্য, ছোট ভাই মোঃ জুবেদ আহমদ, রিজার্ভ ইন্সপেক্টর (আর,আই), নরসিংদী’র কথা বললে খুশি হন, ধন্যবাদ জানান। আর,আই লিখতে গিয়ে মনে পড়ল চট্টগ্রামে আমাদের ছোট ফুফু কবি বেগম শামসুন্নাহার’র বাসায় এক লোক কাজ করতো, তার নাম ছিল আর,আই। বড় চাচা মোহাম্মদ বদরুজ্জামান তখন বাংলাদেশ ডাক বিভাগের এপিএমজি। তিনি সরকারি ফোনে চট্টগ্রামে বোনের বাসায় ফোন করলে সে প্রান্ত থেকে ফোন ধরেই বলে হ্যালো আমি আর,আই। রং নম্বর এবং কিছুটা ভয়েও বড় চাচা দ্রুত ফোন কেটে দিতেন। পরে ফুফু ফোন ধরলে আর,আই রহস্যের যবনিকা ঘটে।
মাগরিবের নামাজ আদায় করে সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় পাশে থাকা এমটিবি লাউঞ্জে গিয়ে বসি। মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)’র ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করায় দুইজনের লাউঞ্জ ব্যবহারের অবারিত সুবিধা থাকে। রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত এখানে থাকতে হবে, রাত ৯.৩৫ এর ইত্তেহাদ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ছেড়ে যাবে, সি-৮ কাউন্টার থেকে রাত ৮.৫০ বোর্ডিং শুরু হবে। লাউঞ্জে বসে দেখে দেখে স্বল্প পরিমাণে খাবার ও পানীয় গ্রহণ করছি। নানান জনের সাথে কথা বলছি। সফরের নিউজ লিখে সংবাদমাধ্যমের ঘনিষ্ঠ দু’জনের কাছে পাঠালাম। নিজের সফরের ফলাও প্রচারের জন্য নয়, ইউএস’র কোন রাজ্যে কোনদিন থাকব তা জানানোর জন্য।
আমেরিকায় থাকা অনেকেই ফোন করছেন, দেখা করতে চান। এমটিবি লাউঞ্জে নিরাপদে বসে অনেক খাবার দাবারের পাশাপাশি সুন্দর সময় কাটালাম। মালামাল রেখে পাশের মসজিদে এশার নামাজ আদায় করে এলাম। শেষ সময়ে হালকা ডিনার (সাদা ভাত, মেজবানি বিফ, চিকেন কারি, তার্কি ডিশ, ফিশ, ভেজেটেবল, সালাদ) করে ওয়াশরুম ব্যবহার করে বোর্ডিং এরিয়ায় (সি/৮) চলে গেলাম। সেখানে লম্বা লাইন, পৃথিবীর নানা প্রান্তের যাত্রিদের আবুধাবিতে নেয়া হবে এ বিমানে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৯.৩৫ এর স্থলে রাত দশটায় আকাশে ওড়াল দিল ইত্তেহদের বিমান।