লেখক প্রকাশক রাজীব চৌধুরীর প্রকাশনীতে একঝাক লেখকদের নিয়ে প্রায়ই সাহিত্য আড্ডা জমে। সেখানে সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। লেখকদের সাথে এমন আড্ডা কার না ভালো লাগে। সিলেটের পরিচিত প্রকাশনী চৈতন্যেতে লেখকদের সেই সাহিত্য আড্ডা নিয়ে লেখক রাজীব চৌধুরী নিজের ফেসবুকে পেইজে অনুভুতি কথা লিখেছেন। আমার সিলেট পাঠকদের জন্য সাহিত্য পাতা যুক্ত করা হলো–
সাহিত্যে ভেড়ার পাল ও সিংহের নিঃসঙ্গতা
আয়োজন করে নয়—চৈতন্যে আয়োজন ছাড়াই সাহিত্য, শিল্প, দর্শন আর জীবন নিয়ে মাঝেমধ্যে আড্ডা বসে যায়। ব্যানার থাকে না, সভাপতি থাকেন না, প্রধান অতিথিও না। ফলে কে ‘বিশিষ্ট’, কে ‘বরেণ্য’, আর কে ‘প্রথিতযশা’—এই অত্যন্ত জরুরি রাষ্ট্রীয় সমস্যাটিরও সমাধান করা হয় না।
এমন আনন্দযজ্ঞ আমার প্রায়ই মিস হয়ে যায়। গতকাল আর মিস করিনি।
সময় আসলে নিষ্ঠুর। ঘড়ির কাঁটা একদিকে এগোলে অন্যদিকে কিছু না কিছু বাদ পড়বেই। আমার নিজের ব্যস্ততা এখন লেখালিখি আর সামনে আরেকটি দেশের পথে বেরিয়ে পড়ার পরিকল্পনা নিয়ে। এর মধ্যেও প্রকাশনার কাজও থেমে নেই।
গতকালের আড্ডায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কাউকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এবং সম্ভবত এটাই সবচেয়ে স্বস্তির। কারণ আমাদের সাহিত্যজগতে আজকাল মানুষের নামের চেয়ে নামের আগের অংশটি দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে—বিশিষ্ট গবেষক, বরেণ্য লেখক, প্রথিতযশা সম্পাদক, নন্দিত কবি, খ্যাতিমান গদ্যকার…বিশেষণ পড়তে পড়তে মূল নাম পর্যন্ত পৌঁছাতে পাঠকের খানিকটা ধৈর্য লাগে।কখনো মনে হয়, সাহিত্যিক নয়—নতুন কোনো ব্র্যান্ড বাজারে এসেছে।
‘
বিশিষ্ট’ হওয়ার জন্য এখন আর বিশিষ্ট কোনো লেখা থাকা সবসময় জরুরি নয়। কয়েকটি অনুষ্ঠান, কয়েকটি ছবি, পরস্পরের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, একে অন্যকে নিয়ে দু-চারটি প্রশংসাবাক্য—তারপর একদিন দেখা যাবে, নামের আগে বিশেষণটি স্থায়ী হয়ে গেছে।
তারপর শুরু হয় এক আশ্চর্য বৃত্তাকার সাহিত্যচর্চা—
আমি আপনাকে ‘বরেণ্য’ বলব,
আপনি আমাকে ‘বিশিষ্ট’ বলবেন;
তিনি আমাদের দুজনকে ‘প্রথিতযশা’ বলবেন।
এভাবেই বাংলা সাহিত্যে তিনজন নতুন মহীরুহ জন্ম নেবেন।
শুধু সাহিত্যটাই মাঝখানে একটু অনুপস্থিত থাকবে।
অথচ সাহিত্যের প্রশ্নগুলো ভয়ংকর সরল—
আপনি কী পড়েছেন?
আপনি কী লিখেছেন?
আর আপনার লেখা থেকে একটি বাক্য কি একজন অচেনা মানুষের নিঃসঙ্গ রাতে তার পাশে বসতে পারে?
এই পরীক্ষায় কোনো বিশেষণ নম্বর বাড়ায় না।
জীবনানন্দ পড়তে পড়তে কখনো কি নিজের ভাষার দারিদ্র্য টের পেয়েছি?
র্যাবোর A Season in Hell কিংবা তার কবিতার উন্মত্ত ভাষাজগৎ আমাদের কখনো অস্বস্তিতে ফেলেছে?
বোদেরলেয়ারের Les Fleurs du mal কি আমাদের শিখিয়েছে—সৌন্দর্য শুধু ফুলের বাগানে জন্মায় না, সভ্যতার পচনের মধ্যেও তার অদ্ভুত জন্ম হতে পারে?
রিলকে পড়তে গিয়ে কখনো কি মনে হয়েছে—মানুষের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনো সাহিত্যসভায় পাওয়া যায় না; সেগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন একা থাকতে হয়?
দস্তয়েভস্কির মানুষের অন্ধকার, কাফকার অসহায়তা, কামুর অস্তিত্বের অস্বস্তি কিংবা রবীন্দ্রনাথের বিপুলতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের লেখকসত্তাকে কখনো খুব ছোট মনে হয়েছে?
যদি হয়ে থাকে, ভালো।
কারণ মহৎ সাহিত্য মানুষকে শুধু জ্ঞান দেয় না—নিজের সীমাবদ্ধতার সংবাদও দেয়।
সক্রেটিসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই প্রাচীন বোধটির সৌন্দর্য এখানেই—নিজের না-জানাটুকু বুঝতে পারাও জ্ঞানের শুরু।
তাই প্রকৃত পাঠকের একটি লক্ষণ আমার খুব প্রিয়: সে যত পড়ে, নিজের নামের আগে বিশেষণ বসাতে তত লজ্জা পায়।
আর অল্প পাঠের একটি বিপদ আছে।
অল্প পড়লে পৃথিবীটাকে ছোট মনে হয়। তখন নিজের দশটি কবিতাকেই মহাদেশ মনে হতে পারে। নিজের বন্ধুবৃত্তকে সাহিত্যজগৎ, নিজের অনুষ্ঠানকে ইতিহাস এবং নিজের পুরস্কারকে নোবেলের নিকটাত্মীয় ভাবার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
বেশি পড়লে বিপদ অন্যরকম
তখন বোঝা যায়—সামনে হোমার দাঁড়িয়ে আছেন, পেছনে দান্তে; একটু দূরে শেক্সপিয়র, দস্তয়েভস্কি, বোদেরলেয়ার, রিলকে; বাংলায় রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, মানিক, বিভূতিভূষণ…
তখন নিজের নামের আগে ‘বিশিষ্ট’ লিখতে হাত একটু কাঁপে। এই কাঁপাটুকুই সম্ভবত সাহিত্যবোধ।
আরেকটি বিষয় আমাকে বরাবরই আনন্দ দেয়—চৈতন্যকে ঘিরে কখনো কোনো সাহিত্যিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে পারিনি।এ ব্যর্থতার জন্য আমি বেশ গর্বিত।
আমার কাছে ‘আমাদের লেখক’ এবং ‘ওদের লেখক’ বলে কোনো তালিকা নেই। কার সঙ্গে কার ছবি আছে, কে কোন টেবিলে বসে, কে কাকে পুরস্কার দিল—এসব দিয়ে সাহিত্য মাপার বিদ্যা এখনো আয়ত্ত করতে পারিনি।
ভেড়ার পালের অবশ্য অনেক সুবিধা।
একটি ভেড়াকে শুধু সামনের ভেড়াটির পেছনে হাঁটতে হয়। পথ কোথায় যাচ্ছে, সে প্রশ্ন অপ্রয়োজনীয়। দল আছে, নিরাপত্তা আছে, সম্মিলিত ডাকও আছে।
সিংহের সমস্যা অন্য জায়গায়।
তাকে প্রায়ই একা হাঁটতে হয়।
সাহিত্যও শেষ পর্যন্ত সেই একা হাঁটার শিল্প।লেখক যখন সাদা কাগজের সামনে বসেন, তাঁর পাশে কোনো সিন্ডিকেট বসে না। কোনো ‘বরেণ্য’ বিশেষণ এসে বাক্য লিখে দেয় না। পুরস্কারের ক্রেস্টও কলম ধরে না।
সেখানে মানুষটি একা।
সঙ্গে শুধু তার পাঠ, অভিজ্ঞতা, ক্ষত, কৌতূহল এবং ভাষা।
তাই চৈতন্যের পথচলায় আমি ভেড়ার বিশাল পাল চাই না।
বরং অল্প কয়েকজন স্বাধীন মানুষ থাকুক—যাঁরা প্রচুর পড়েন, গভীরভাবে ভাবেন, প্রয়োজন হলে দ্বিমত করেন; যাঁরা প্রশংসার চেয়ে একটি সৎ সমালোচনাকে বেশি মূল্য দেন; যাঁরা দশটি মাঝারি বই প্রকাশের চেয়ে একটি সত্যিকারের বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন।
এমন লেখক থাকুন, যাঁকে ‘বিশিষ্ট লেখক’ বললে তিনি একটু অস্বস্তিতে পড়েন।
এমন গবেষক থাকুন, যিনি নিজের নামের আগে ‘বিশিষ্ট গবেষক’ লেখার চেয়ে ফুটনোটের একটি ভুল নিয়ে বেশি চিন্তিত।
এমন সম্পাদক থাকুন, যিনি নিজের ছবি ছাপানোর চেয়ে একটি দুর্বল বাক্য বাদ দিতে বেশি আনন্দ পান।
আর এমন পাঠক থাকুন, যিনি লেখকের পরিচিতি দেখে নয়—প্রথম অনুচ্ছেদ পড়েই সিদ্ধান্ত নেন সামনে এগোবেন কি না।
কারণ সাহিত্য গণতন্ত্র হতে পারে, কিন্তু সাহিত্যিক মূল্য কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোটে নির্ধারিত হয় না।
এক হাজার মানুষ মিলে একটি দুর্বল বাক্যকে অসাধারণ বললেও বাক্যটি অসাধারণ হয়ে যায় না।
আবার কোনো নিঃসঙ্গ ঘরে লেখা একটি সত্য বাক্যকে কেউ না পড়লেও তার সত্য কমে যায় না।
এই জায়গাটিতেই সাহিত্য নির্মম এবং সুন্দর।
চৈতন্যে আড্ডা বসে ঘোষণা ছাড়াই।
কোনো সিন্ডিকেটের অনুমতিতে নয়।
কোনো বিশেষণের ভার নিয়ে নয়।
কেউ জীবনানন্দ নিয়ে আসুক, কেউ রিলকে। কেউ বোদেরলেয়ারের অন্ধকার নিয়ে তর্ক করুক, কেউ র্যাবোর উন্মত্ততা নিয়ে। কেউ নতুন কোনো তরুণের একটি অসাধারণ কবিতা আবিষ্কার করে নিয়ে আসুক।
তারপর তর্ক হোক। দ্বিমত হোক। চা ঠান্ডা হয়ে যাক।
শুধু সাহিত্যটা যেন গরম থাকে।
ভেড়ার পাল বড় করার চেয়ে কয়েকটি স্বাধীন সিংহের নিঃসঙ্গ পদচিহ্ন আমার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।
আর শেষ পর্যন্ত লেখকের নামের আগে কোনো বিশেষণ না থাকাই ভালো।
যদি তাঁর লেখা সত্যিই ভালো হয়—
বিশেষণের কাজটুকু তাঁর বাক্যই করে দেবে।



