
সাইফুল ইসলাম বাবু, জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি:
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী রাংপানি নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও নদীর পাড় কাটা বন্ধে জনসচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় উপজেলার ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নের কেন্দ্রী মিনাটিলা এলাকার সীমান্তবর্তী গ্রাম ঝিঙ্গাবাড়ীস্থ মিনি সুইজারল্যান্ড স্পোর্টিং ক্লাবের সামনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ সুনন্দা রায়। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জৈন্তাপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হাজি আলমগীর হোসেন, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও শ্রীপুর পাথর কোয়ারি বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল আহাদ, স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল হালিম, ৪ নম্বর বাংলাবাজার বালু-পাথর ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আহমদ আলী, জৈন্তাপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলাম এবং স্থানীয় মুরব্বি ফরিদ মিয়া, আব্দুর রহিমসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সভায় বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রীপুর পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় এলাকার অনেক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর যোগসাজশে শ্রমিকদের দিয়ে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দিনের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও রাংপানি নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীর মাঝখান থেকে বালু উত্তোলনের পাশাপাশি এখন বিভিন্ন স্থানে নদীর পাড় কেটে বালু তোলা হচ্ছে, যা স্থানীয় জনপদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অব্যাহতভাবে নদীর পাড় কাটার কারণে নদীতীরবর্তী ফসলি জমি ভাঙনের কবলে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট বিলীন হতে শুরু করেছে এবং অনেক বসতবাড়ি রয়েছে ঝুঁকির মুখে। ফলে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার অভিযান পরিচালনা ও জরিমানা করা হলেও নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না।
সভায় রাংপানি নদীতে প্রতিবছর ঘন ঘন পাহাড়ি ঢল নামার বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে পাহাড়ি ঢলের সময় ভাঙনের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। এতে ফসলি জমি, গ্রামীণ সড়ক, বসতবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীরবর্তী এলাকার পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এসব সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে এলাকাকে রক্ষায় নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন বন্ধে সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও মিজ সুনন্দা রায় বলেন, বৈধভাবে ইজারা দেওয়া বালুমহল থাকলেও নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন কিংবা নদীর পাড় কেটে বালু নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অধিক লাভের আশায় আইন অমান্য করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে এবং নদী ও জনপদের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি বলেন, রাংপানি নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন নিয়ে প্রতিনিয়ত সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে। প্রশাসন স্থানীয় মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণে কাজ করতে চায়। কিন্তু অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে বারবার অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে প্রশাসনের মূল্যবান সময় ব্যয় হচ্ছে। এতে এলাকার রাস্তাঘাট, স্কুলসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়াও ব্যাহত হয়।
ইউএনও আরও বলেন, “আমি আপনাদের সাহায্য করতে চাই, আপনারাও আমাকে সাহায্য করুন। নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আপনাদের এলাকার উন্নয়নের জন্য যেসব কাজ প্রয়োজন, সেগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে তুলে ধরতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
তিনি স্থানীয়দের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিশুদের সামনে এমন কোনো দৃষ্টান্ত তৈরি করা উচিত নয়, যাতে তারা আইন অমান্য করাকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে শিখে। শ্রীপুর পাথর কোয়ারি-সংক্রান্ত বিষয়েও তিনি বলেন, কোয়ারির জন্য উপযুক্ত জায়গার প্রস্তাব স্থানীয়রা দিলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে সব কার্যক্রম নিয়ম ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া মেনেই পরিচালনা করতে হবে।
সভায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, শ্রীপুর পাথর কোয়ারি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বহু মানুষের জীবিকা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং শ্রীপুর পাথর কোয়ারি চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ওপর নির্ভরশীলতা কমতে পারে। এ সময় কোয়ারিতে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের সুযোগ সৃষ্টির দাবিও জানানো হয়।
সভায় সংশ্লিষ্ট নৌকার শ্রমিক, বালু ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের নদীর পাড় না কাটা, ফসলি জমি নষ্ট না করা এবং পরিবেশ ও জনপদের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধ, এলাকার রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি রক্ষা এবং শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের মতামত ও পরামর্শ নেওয়া হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, রাংপানি নদী ও তীরবর্তী জনপদ রক্ষায় শুধু প্রশাসনিক অভিযান যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা, কৃষিজমি রক্ষা এবং পাহাড়ি ঢলের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নদীর পাড় কেটে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
