চা-বাগানের জন্য পরিচিত মৌলভীবাজারে আবারও সম্ভাবনা জাগাচ্ছে কফি চাষ। একসময় এ অঞ্চলে চায়ের পাশাপাশি কফি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যক্রম চালু থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা প্রায় হারিয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর সরকারি সহায়তা, কৃষকদের আগ্রহ এবং পতিত জমি কাজে লাগানোর সুযোগে জেলাটিতে নতুন করে বিস্তৃত হচ্ছে কফি চাষ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কফি চাষ সম্প্রসারণের কাজ চলছে। কৃষকদের বিনা মূল্যে অ্যারাবিকা ও রোবাস্তা জাতের কফির চারা দেওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ করা হচ্ছে কারিগরি সহায়তা। মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল, রাজনগর ও আকবরপুর এলাকায় এ চাষের বিস্তার ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক নীলুফার ইয়াসমিন মোনালিসা সুইটি জানান, জেলায় কফি চাষের পরিধি বাড়ছে। কৃষকেরা পতিত জমি ও মিশ্র ফলের বাগানে কফি চাষ করছেন। এ খাতের সম্প্রসারণে উচ্চপর্যায়েও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
কৃষকদের সাফল্যও এ চাষে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। আকবরপুরের কৃষক আব্দুল মান্নান প্রায় ১ হাজার ৮০০টি কফিগাছ চাষ করছেন। কফি বিক্রি করে ইতিমধ্যে লক্ষাধিক টাকা আয় করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা আতর আলী তিন বছর আগে ৩০০টি কফিগাছ রোপণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গাছের উৎপাদিত কফি থেকে তিনি ২৫ হাজার টাকা আয় করেছেন।
চা-বাগানেও কফি চাষের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। রাজনগরের উত্তরবাগ চা-বাগানে ইতিমধ্যে ৩ হাজার কফির চারা রোপণ করা হয়েছে। বাগানটির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. লোকমান চৌধুরী জানান, কফি চাষে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতা পাচ্ছেন তাঁরা।
কৃষিবিদ সুকল্প দাসের মতে, মৌলভীবাজারে কফি চাষের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ব্রিটিশ শাসনামলে ফিনলে কোম্পানি জেলার জগছড়া ও সোনাছড়া চা-বাগানে কফির বাগান এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র পরিচালনা করত। তবে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চায়ের চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের কারণে কফি চাষ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি মনে করেন, মৌলভীবাজারের জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতি কফি চাষের জন্য উপযোগী। পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ, যথাযথ পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ জেলা দেশের অন্যতম কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
কফি চাষের এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে পতিত জমির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের আয়ের নতুন পথও তৈরি হতে পারে। তবে উৎপাদন বাড়ানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করাই হবে এ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
