নিজাম উদ্দীন সালেহ

সিলেটে এখন শীত আসার কথা। হেমন্তের হিমেল হাওয়া, ভোরে কুয়াশা, কিন্তু তার বদলে টিলা-শহর জুড়ে ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করছেন মানুষ। আবহাওয়া অফিসের খাতায় আজ ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় তাপমাত্রা মাত্র ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু অনুভূত হচ্ছে ৩৪ ডিগ্রি। এই ৫ ডিগ্রির ব্যবধানই মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। কেন এই অস্বস্তি? এর পেছনে চারটি কারণ রয়েছে।

সিলেটের ভূগোলই এর জন্য দায়ী। চারপাশে হাওর, পাহাড়, চা-বাগান। বর্ষার পানি এখনো হাওরে রয়েছে, সেখান থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প বাতাসে মিশছে। আজ সন্ধ্যায় বাতাসে আর্দ্রতা ৭৭ শতাংশ, রাত ১১টার পর তা ৯৩ থেকে ৯৮ শতাংশে উঠবে বলে পূর্বাভাস। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে মানুষের ঘাম শুকায় না। ঘাম না শুকালে শরীর ঠান্ডা হয় না। তাই থার্মোমিটারে ২৯ ডিগ্রি দেখালেও শরীরে মনে হয় ৩৪ ডিগ্রি। আবহাওয়াবিদরা একে বলেন ‘হিট ইনডেক্স’ বা অনুভূত তাপ। সিলেটে এখন হিট ইনডেক্সই প্রধান শত্রু।

আজ সিলেটে বাতাস প্রায় নেই বললেই চলে। ঘণ্টায় মাত্র ৩ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইছে, তাও দিক পরিবর্তন করছে — কখনো উত্তর, কখনো দক্ষিণ। বাতাস না থাকলে গরম বাতাস এক জায়গায় আটকে থাকে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আজ রাত ২টা থেকে সিলেটে বিক্ষিপ্ত বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। বৃষ্টির আগে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বেড়ে ১০১১ হেক্টোপ্যাসকেলে আটকে আছে। এই উচ্চচাপ গরমকে মাটির কাছাকাছি আটকে রাখে। গ্রামের মানুষ যাকে বলে ‘গুমোট’ — মেঘ আছে, বৃষ্টি নেই, বাতাস নেই, শুধু ঘাম। টিলা এলাকায় এই গুমোট আরও বেশি লাগে, কারণ কংক্রিটের বাড়ি দিনের তাপ ধরে রাখে।

আজ সিলেটের বাতাসের মান ১৩৬, যা সংবেদনশীলদের জন্য অস্বাস্থ্যকর। প্রধান দূষক ওজোন (০৩)। অক্টোবরের শেষে যখন রোদ থাকে, কিন্তু বাতাস থাকে না, তখন মাটির কাছাকাছি ওজোন জমে যায়। এই ওজোন এক ধরনের গ্রিনহাউজ গ্যাসের মতো কাজ করে, দিনের তাপকে রাতে বের হতে দেয় না। তাই সন্ধ্যার পরও গরম কমছে না। গত কয়েকদিন সিলেটে যানবাহন ও ইটভাটার ধোঁয়াও বেড়েছে। এই দূষণের চাদর সূর্যের তাপকে আটকে রাখছে।

এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে সিলেটে অক্টোবর মাসের গড় তাপমাত্রা ১.২ থেকে ১.৫ ডিগ্রি বেড়েছে। আগে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সিলেটে রাতের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির নিচে নেমে যেত, এখন তা ২৪-২৫ ডিগ্রিতে আটকে থাকছে। শীতকাল ছোট হচ্ছে, হেমন্তকাল গরম হচ্ছে। এবার বর্ষা দেরিতে শেষ হয়েছে, তাই হেমন্তের শুষ্ক বাতাস আসতে দেরি হচ্ছে। তবে এই গরম স্থায়ী নয়। আজ রাত ২টা থেকে আগামীকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টির পর তাপমাত্রা ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি কমে যাবে। আগামীকাল সর্বোচ্চ ৩২, সর্বনিম্ন ২৪ ডিগ্রিতে নামতে পারে। তবে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ভ্যাপসা ভাব পুরোপুরি যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *