ভুল পরিকল্পনা, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে হবিগঞ্জের শাহজিবাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে প্রকল্পের মোট বাজেটের ৭০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও কেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিড কোনো সুবিধা পাচ্ছে না।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সময়মতো উৎপাদনে যেতে পারলে গত ছয় বছরে এ কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যেত। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ এই সময়ে পরীক্ষামূলক পর্যায় মিলিয়ে মাত্র ৩৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।

দৈনিক ২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত দেশ

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, এই কেন্দ্রটি চালু থাকলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হওয়ার কথা ছিল, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা।

২০১৭ সালে হবিগঞ্জের শাহজিবাজারে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই অত্যাধুনিক গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু করে পিডিবি। ৮৯০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মূল কাজ পায় চীনা প্রতিষ্ঠান ‘চায়না ক্যাবল করপোরেশন ইঞ্জিনিয়ারিং সিসিসিই লিমিটেড’। কেন্দ্রে আমেরিকান বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রনিক্সের (GE) এলএমএস-১০০ মডেলের অত্যাধুনিক অ্যারো-ডেরিভেটিভ গ্যাস টারবাইন বসানো হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের জুনে এটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল।

করোনা ও বারবার ব্লেড ভাঙার ট্র্যাজেডি

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সালের মার্চে কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হলে জেনারেল ইলেকট্রনিক্সের বিদেশি প্রকৌশলীরা নিজ দেশে ফিরে যান, যার ফলে শুরুতেই কাজ পিছিয়ে পড়ে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে কেন্দ্রটি নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা (RTR) সম্পন্ন করে চালু করা হয়। কিন্তু চলন্ত অবস্থায় আকস্মিকভাবে এর গ্যাস টারবাইনের ব্লেড ভেঙে যায়।

এরপর মেরামত শেষে ২০২১ সালের ২৯ অক্টোবর আবার চালু করা হলেও পুনরায় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এবার পুরো ‘সুপার কোর মেশিন’ পরিবর্তন করে আনা হয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি আবারও উৎপাদনে যায়। কিন্তু মাত্র দুই মাস চলার পর ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল আবারও প্লান্টের ব্লেড ভেঙে যায়। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এভাবেই অচল হয়ে পড়ে আছে কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্প।

৭০ শতাংশ বিল পরিশোধ, আটকে আছে ১০ শতাংশ

চুক্তির শর্তানুযায়ী চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে মোট বিলের প্রায় ৭০ শতাংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। পিডিবি জানিয়েছে, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে ক্ষতিপূরণ বাবদ আটকে রাখা ১০ শতাংশ অর্থ (প্রায় ৯০ কোটি টাকা) জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে সমন্বয় করা হবে।

শাহজিবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মান্নান জানান:

“পিডিবি যেহেতু বিপুল পরিমাণ টাকা ইনভেস্ট করে ফেলেছে এবং ইতোমধ্যে ৭০ ভাগ পেমেন্ট দেওয়া হয়ে গেছে, সে হিসাবে পিডিবি অবশ্যই এটা চালু করবে। তবে নির্ধারিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত সক্ষমতা দেখাতে না পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।”

তিনি আরও যোগ করেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর উদ্যোগ নিতে পারে। সরকারি উদ্যোগে কেন্দ্রটি পরিচালিত হলে অতিরিক্ত ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হবে না এবং উৎপাদন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

পুনরায় চালুর সম্ভাব্য সময় ২০২৭ সালের জুন

বর্তমানে বিদ্যুৎ প্লান্টের যন্ত্রাংশ মেরামত ও প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন মূল প্রতিষ্ঠানের (GE) সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। পিডিবি’র বর্তমান পরিকল্পনা ও মেরামতের গতি অনুযায়ী সবকিছু ঠিকঠাক এগোলে ২০২৭ সালের জুন মাসের দিকে প্লান্টটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় অর্থের এমন অপচয় ও দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *