ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের ইতিহাস নিয়ে মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই মতপার্থক্য রয়েছে। একদল মনে করেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার জন্মদিনের কথা স্মরণ করতেন এবং সোমবার রোজা রাখার মাধ্যমে এ দিনের প্রতি গুরুত্ব প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে আরেকদল আলেমের মত, নবীজি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের সময়ে বর্তমানের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে জন্মদিন পালনের রীতি ছিল না; পরবর্তী সময়ে এটি প্রচলিত হয়।

মিলাদুন্নবী পালনের প্রচলিত রীতি

বর্তমানে বিভিন্ন মুসলিম সমাজে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে নানা ধরনের কর্মসূচি দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে কোরআন তিলাওয়াত, নাত ও দরুদ পাঠ, জিকিরের আয়োজন, আলোচনা সভা, খাবার ও মিষ্টি বিতরণ এবং বিভিন্ন স্থান সাজানো। মিলাদ পালনের পক্ষে যারা মত দেন, তারা সোমবার রোজা রাখার বিষয়ে হাদিসকে অন্যতম দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন। হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) সোমবার রোজা রাখার কারণ হিসেবে এই দিন তার জন্মের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলাদুন্নবী পালনের ইতিহাস নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। কেউ এর সূচনা ফাতেমীয় শাসনামলে হয়েছে বলে মনে করেন। আবার ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বিষয়টি এত সরলভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

ফাতেমীয় শাসনামলে মিলাদ

মিসরে ফাতেমীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পর মিলাদকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। ৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মিসর ফাতেমীয়দের নিয়ন্ত্রণে আসার পর খলিফা আল-মুইজ লিদিনিল্লাহর শাসনামলে এ ধরনের আয়োজনের প্রচলন হয় বলে উল্লেখ করা হয়। কিছু ইতিহাসবিদের মতে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রেও এসব আয়োজন ভূমিকা রেখেছিল। তবে সে সময়ের মিলাদ আজকের প্রচলিত আয়োজনের মতো ছিল না। মিষ্টি ও সদকা বিতরণ ছিল এর অন্যতম অংশ।

অনুষ্ঠানে কাজি আল-কুজাতের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হতো। অংশগ্রহণকারীরা আল-আজহার মসজিদের দিকে যেতেন। পরে বিভিন্ন প্রতিনিধি খলিফার প্রাসাদে উপস্থিত হতেন। সেখানে বক্তব্য ও দোয়ার আয়োজন শেষে সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতেন। ফাতেমীয়রা শুধু মহানবী (সা.)-এর জন্ম স্মরণ করেই অনুষ্ঠান করত না; ইমাম আলী (রা.), সাইয়্যিদা ফাতিমা জাহরা (রা.) এবং তৎকালীন ফাতেমীয় ইমামের জন্ম উপলক্ষেও আয়োজন করা হতো। অবশ্য খলিফা আল-মুস্তালি বিল্লাহর শাসনামলে এসব আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানেও শিয়া মুসলমানদের মধ্যে মিলাদুন্নবী পালনের প্রচলন রয়েছে। তবে জন্মতারিখ নির্ধারণে সুন্নিদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য আছে। শিয়া মত অনুযায়ী, মহানবী (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের ১৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন।

সুন্নি সমাজে মিলাদের প্রচলন

মিলাদুন্নবী শুধু ফাতেমীয়দের মাধ্যমেই প্রচলিত হয়েছিল, এমন ধারণার সঙ্গে সব ইতিহাসবিদ একমত নন। বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও ইতিহাসবিদ জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি এ বিষয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তার ‘হাসানুল মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ’ গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্রচলিত বড় পরিসরের মিলাদ আয়োজনের অন্যতম প্রাথমিক উদাহরণ পাওয়া যায় আরবিলের শাসক বাদশা মুজাফফরুদ্দীন আবু সাঈদ কৌকরীর সময়ে। মুজাফফরুদ্দীনের দানশীলতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেছেন একাধিক ঐতিহাসিক ও আলেম। ইবনে কাসির, আজ-জাহাবি, সিবত ইবনে আল-জাওজি এবং ইবনে খাল্লিকানের মতো ব্যক্তির লেখায় তার কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়।

ইবনে কাসিরের বর্ণনায়, রবিউল আউয়াল মাসে মুজাফফর মহানবী (সা.)-এর জন্ম উপলক্ষে বড় ধরনের আয়োজন করতেন। এসব অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিতেন এবং খাবার পরিবেশন করা হতো। সিবত ইবনে আল-জাওজির বর্ণনায় একটি মিলাদ অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ খাবার ও মিষ্টি পরিবেশনের কথা পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আলেম ও সুফিরা সেখানে উপস্থিত হতেন। শাসক তাদের উপহার ও অর্থ দিতেন বলেও ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

মুজাফফরুদ্দীনের জনকল্যাণমূলক কাজের কথাও বিভিন্ন গ্রন্থে এসেছে। তিনি দরিদ্রদের খাবার ও পোশাক দিতেন, এতিম ও নারীদের জন্য আলাদা স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন এবং অসুস্থদের খোঁজ নিতেন। পথিক ও মুসাফিরদের জন্য অতিথিশালার ব্যবস্থাও ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন মাজহাবের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কথাও জানা যায়।

আজ-জাহাবির বর্ণনায় মিলাদ উপলক্ষে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ আরবিলে আসতেন। অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ প্যাভিলিয়ন নির্মাণ ও সাজসজ্জা করা হতো। সেখানে ধর্মীয় বক্তৃতা, সংগীতসহ বিভিন্ন আয়োজন থাকত। কয়েক দিন ধরে চলা এসব অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ পশু জবাই করে খাবার প্রস্তুত করা হতো এবং দরিদ্র ও অতিথিদের মধ্যে তা বিতরণ করা হতো।

উসমানীয় আমলেও ছিল মিলাদের আয়োজন

পরবর্তী সময়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যেও মিলাদুন্নবী গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে পালিত হয়েছে। উসমানীয় সুলতানরা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতেন এবং মিলাদও তার ব্যতিক্রম ছিল না।সাধারণত সুলতানের নির্ধারিত বড় কোনো মসজিদে মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও আলেমরা আনুষ্ঠানিক পোশাকে সেখানে উপস্থিত হতেন এবং সুলতানের আগমনের অপেক্ষা করতেন সুলতান ঘোড়ায় চড়ে আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রার মাধ্যমে মসজিদে পৌঁছাতেন। শোভাযাত্রায় পতাকা ও সামরিক সদস্যরা থাকতেন এবং সাধারণ মানুষও এতে অংশ নিতেন। মসজিদে পৌঁছানোর পর কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হতো। এরপর মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও জীবন নিয়ে বর্ণনা পাঠ করা হতো। দরুদ, জিকির ও নাত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান এগিয়ে যেত। সাধারণত ১২ রবিউল আউয়ালের আগের রাতে মূল ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হতো। পরদিন বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে শুভেচ্ছা জানাতেন।

মিলাদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে কেন মতভেদ?

মিলাদুন্নবী পালনের বৈধতা নিয়ে ইসলামী ফিকহের আলেমদের মধ্যে একক মত নেই। কেউ এটিকে প্রশংসনীয় কাজ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ এটিকে পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া বিদআত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। যেসব আলেম মিলাদ আয়োজনকে অনুমোদন করেছেন, তাদের যুক্তি হলো এ ধরনের অনুষ্ঠানে মহানবী (সা.)-এর জীবন, চরিত্র ও শিক্ষা স্মরণ করা হয় এবং তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। ইমাম সুয়ুতি, ইবনে হাজার আল-আসকালানি, সাখাওয়ি, ইবনে আবেদিন, ইবনে আল-জাজারি, ইমাম নববী ও কাস্তাল্লানির মতো আলেমদের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে ইবনে তাইমিয়া, আশ-শাতিবি ও তাজুদ্দিন আল-ফাকিহানিসহ কয়েকজন আলেম এ ধরনের আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বিরোধিতা করেছেন। তাদের যুক্তি, মহানবী (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও প্রথম যুগের মুসলমানরা এভাবে জন্মদিন উদযাপন করেননি। তাই পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া এমন আয়োজনকে তারা বিদআত হিসেবে দেখেছেন।

বর্তমানে এ বিষয়ে মতপার্থক্য বিশেষ করে সুফি ও সালাফি ধারার মুসলমানদের মধ্যে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সুফি তরিকার অনুসারীদের বড় একটি অংশ মিলাদ আয়োজনকে গুরুত্ব দেন। বিপরীতে সালাফি আলেমদের বড় অংশ এটিকে শরিয়তসম্মত মনে করেন না।

সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ ইবনে বাজও মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিরোধিতা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মহানবী (সা.) নিজে এবং তার সাহাবিরা এভাবে জন্মদিন পালন করেননি। তাই শরিয়তে এর পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই বলে তিনি মনে করেন।

সব মিলিয়ে, ঈদে মিলাদুন্নবী পালন ইসলামী ইতিহাস ও ফিকহের একটি বিতর্কিত বিষয়। এর সূচনা, প্রচলন এবং ধর্মীয় বিধান নিয়ে বিভিন্ন যুগের আলেম ও ইতিহাসবিদদের মধ্যঅনুসরণীয়। তার চরিত্র, ক্ষমাশীলতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা আজও বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *