ঘুমের মধ্যে মানুষ কেন দাঁত কিড়মিড় করে, কাদের হয় এটি?

ঘুমের মধ্যে মানুষ কেন দাঁত কিড়মিড় করে, কাদের হয় এটি?

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোয়ালে তীব্র ব্যথা, অবশ ভাব কিংবা মাথায় চাবুক মারা যন্ত্রণা—এমন কষ্টদায়ক শারীরিক উপসর্গ নিয়ে ঘুম ভাঙার অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। আবার অনেকে হয়তো বুঝতেই পারেন না, কেন সকালে উঠে দাঁতের শিরশিরানি বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, ঘুমের মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে ও তীব্র শক্তিতে দাঁতে দাঁত ঘষা বা দাঁত চেপে ধরার এই প্রবণতাকে ‘ব্রুক্সিজম’ বলা হয়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি একটি বেশ সাধারণ সমস্যা এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতি চারজনের মধ্যে একজন মানুষ জীবনে কোনো না কোনো সময় এতে আক্রান্ত হতে পারেন।

বিষয়টি সাধারণ মানুষের জন্য ঠিক কতটা উদ্বেগজনক হতে পারে, তা ফুটে উঠেছে বিশেষ প্রতিবেদন থেকে। প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের ৩১ বছর বয়সী এলা নামে এক নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সকালে উঠে মুখমণ্ডল ও চোয়ালের তীব্র ব্যথায় ভুগছিলেন। সঠিক ধারণা না থাকায় অবহেলার কারণে একপর্যায়ে তার চোয়ালের প্রধান পেশি ফুলে গিয়ে মুখের স্বাভাবিক গঠন চওড়া ও চৌকো আকৃতি ধারণ করতে শুরু করেছিল এবং দাঁত ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক মূল কারণ চিহ্নিত করে চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পান।

ঘুমের মধ্যে মানুষ কেন দাঁত কিড়মিড় করে এবং কারা বেশি আক্রান্ত হন?

প্রস্রাবের এই ৫ লক্ষণ হতে পারে ‘নীরব ক্যানসারের’ সংকেত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করার পেছনে কেবল মুখের ভেতরের সমস্যা নয়, বরং মানসিক ও শারীরিক উভয় ধরনের গভীর কারণ কাজ করে—

দিনের কোন সময়ে ডিম খাওয়া ভালো? জানালেন বিশেষজ্ঞরা

মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: তরুণ প্রজন্ম এবং যারা জীবনের অতিরিক্ত চাপপূর্ণ সময় পার করছেন, তাদের মধ্যে ব্রুক্সিজমের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রাহি পোপাট জানান, তার অনেক রোগী জীবনের তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তগুলোর সঙ্গেই দাঁত কিড়মিড় করার সূচনা বা বৃদ্ধিকে যুক্ত দেখতে পান। সারাদিনের জমে থাকা মানসিক চাপ ও ‘হাই-ফাংশনিং অ্যাংজাইটি’ রাতে ঘুমের মধ্যে মুক্ত করার একটি শারীরিক উপায় হিসেবে ব্রুক্সিজম দেখা দিতে পারে। ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর কাউন্সেলিং অ্যান্ড সাইকোথেরাপি উল্লেখ করেছে যে, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব কীভাবে শরীরে পড়ে, সে বিষয়ে মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।

শ্বাসনালির বাধা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া: ব্রুক্সিজম কেবল মানসিক চাপের বিষয় নয়; এটি শরীরের একটি সুরক্ষামূলক মেকানিজম হিসেবেও কাজ করে। দন্ত বিশেষজ্ঞ ডা. আদিতি দেশাই ও গবেষক অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্ক লোবেজো ব্যাখ্যা করেন, অবস্ট্রাক স্লিপ অ্যাপনিয়া-র মতো শারীরিক সমস্যায় ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালিতে বাধা তৈরি হয়। ফলে শরীর শ্বাসনালি মুক্ত রাখতে এবং স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বজায় রাখার স্বয়ংক্রিয় চেষ্টা হিসেবে দাঁত চেপে ধরে বা কিড়মিড় করে থাকে।

ব্রুক্সিজমের প্রধান লক্ষণসমূহ

সচেতনতা ও সঠিক সময়ে রোগ শনাক্তের জন্য নিচের লক্ষণগুলো জানা জরুরি—

দাঁতের ক্ষতি: দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া, চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া, ভেঙে যাওয়া বা খণ্ডিত হয়ে যাওয়া।

প্রাতঃকালীন ব্যথা ও অস্বস্তি: সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথায় বা মুখে ব্যথা এবং চোয়াল শক্ত বা অবশ হয়ে থাকা।

কানে ব্যথা: কানে কোনো ধরনের সংক্রমণ ছাড়াই কান বা কানের আশপাশের অংশে তীব্র ব্যথা অনুভব হওয়া।

ঘুমের ব্যাঘাত ও ক্লান্তি: গভীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটা এবং পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও দিনের বেলা চরম ক্লান্তি অনুভব করা।

দাঁতের সংবেদনশীলতা: ঠান্ডা বা গরম খাবারে দাঁতের সংবেদনশীলতা (শিরশিরানি) বেড়ে যাওয়া।

দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতি

সময়মতো ব্রুক্সিজম নিয়ন্ত্রণ না করলে তা মারাত্মক শারীরিক ও আর্থিক জটিলতা তৈরি করতে পারে—

দাঁতের স্থায়ী ক্ষতি ও উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়: ডেন্টিস্ট ডা. সাইমন কোভ জানান, অতিরিক্ত দাঁত ক্ষয়ের ফলে পরবর্তীতে ডেন্টাল পুনর্গঠন চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে এবং এতে হাজার হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। তিনি থ্রিডি স্ক্যানের মাধ্যমে রোগীদের দাঁতের ক্ষয়ের মাত্রা নির্ণয় করে থাকেন।

চোয়ালের গঠনে পরিবর্তন: দীর্ঘদিন ধরে রাতে নিয়মিত চোয়ালের পেশি অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পেশি ফুলে যেতে পারে, যা মুখের নিচের অংশকে চওড়া বা চৌকো আকৃতি দেয়।

দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও ডেন্টাল চিকিৎসা ব্যর্থতা: প্রস্থোডন্টিকস বিশেষজ্ঞ ডা. রিয়াজ ইয়ার উল্লেখ করেন, গুরুতর ব্রুক্সিজমের কারণে মুখমণ্ডল ও চোয়ালে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তৈরি হয় এবং বারবার ডেন্টাল চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

চিকিৎসা ও প্রতিকারের কার্যকর উপায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল দাঁত বাঁচাতে নাইটগার্ড দেওয়াই শেষ কথা নয়, বরং সমস্যাটির মূল কারণ খুঁজে বের করে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন—

১. নাইটগার্ড বা মাউথগার্ড: রাতে ঘুমের সময় দাঁতের ঘর্ষণ ও সরাসরি ক্ষয় ঠেকাতে বিশেষ মাউথগার্ড বা নাইটগার্ড ব্যবহার করা হয়।

২. শ্বাসনালির চিকিৎসা: সমস্যাটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হলে শ্বাসনালি খোলা রাখতে সিপ্যাপ মেশিন বা ম্যান্ডিবুলার অ্যাডভান্সমেন্ট ডিভাইস ব্যবহার করা হয়।

৩. বোটক্স ইনজেকশন: মারাত্মক ক্ষেত্রে চোয়ালের অতিরিক্ত সক্রিয় পেশি শিথিল করতে বোটক্স ইনজেকশন দেওয়া হয়, যা সাধারণত ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকে এবং ব্যথা ও ফোলা ভাব কমায়।

৪. থেরাপি ও সুষম জীবনযাপন: মানসিক চাপ কমাতে সিবিটি-র মতো থেরাপি এবং নিয়মিত ধ্যান অত্যন্ত কার্যকর। এর পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করা, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করা এবং সুষম জীবনযাপন ব্রুক্সিজম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৬
  • ১১:৫০
  • ৪:১১
  • ৫:৫৭
  • ৭:১০
  • ৫:৪০