
বড়লেখায় খুনের শিকার প্রবাসী জামাল উদ্দিন ও তার ভাই আব্দুল কাইয়ুম। ছবি : আমার সিলেট
যে বাড়িটি পাঁচ মাস আগেও প্রবাসী এক ভাইয়ের ঘরে ফেরার আনন্দে মুখরিত ছিল, সেখানে আজ শুধুই সুনসান নীরবতা। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বিওসি কেছরীগুল এলাকার ওই বাড়ির মূল ফটকে এখন ঝুলছে মস্ত বড় তালা। নেই কোনো জনমানব; ভেতরে বিরাজ করছে এক ভুতুড়ে পরিবেশ। এখানেই পাঁচ মাস আগে দুর্বৃত্তদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন দুই সহোদর।
গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন কুয়েত প্রবাসী জামাল উদ্দিন ও তাঁর ভাই কৃষক আব্দুল কাইয়ুম। সেই হিসাবে এই হত্যাকাণ্ডের পর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। উল্টো আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে অনবরত হুমকি দিচ্ছে। ফলে জীবনের ভয়ে নিজেদের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে ফেরারি হয়ে দিন কাটাচ্ছে অসহায় পরিবারটি। অথচ যাদের নামে সুনির্দিষ্ট খুনের মামলা, পুলিশের নাকের ডগায় তারা রয়েছে বহাল তবিয়তে। আইনের এমন উল্টোরথ আর প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় পুরো বড়লেখাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
প্রশ্ন উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম অবহেলা, নিষ্ক্রিয়তা আর অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে কি তবে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন?
জানা গেছে, কুয়েত প্রবাসী জামাল উদ্দিন দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষ করে মাত্র কয়েক মাস আগে দেশে ফিরেছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। কিন্তু দেশে ফেরার অল্প দিনের মাথায় ভাইসহ খুনের শিকার হন তিনি। সরেজমিনে বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম) এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভুক্তভোগীদের বাড়িটি এখন সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। পরিবারটি আজ নিজেদের শেষ আশ্রয়টুকুতেও মাথা গোঁজার সাহস পাচ্ছে না।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই একটি চক্র এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখল ও হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিভিন্ন সময় স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও কোনো দৃশ্যমান ফল মেলেনি।
এরই চূড়ান্ত নির্মম রূপ নেয় গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর বিকেলে। বিওসি মাঠগুদাম এলাকায় পূর্বশত্রুতার জের ধরে দুই পক্ষের বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে প্রতিপক্ষ ধারালো রামদা ও লাঠিসোটা নিয়ে দুই ভাইয়ের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। এতে জামাল ও কাইয়ুম ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। একই ঘটনায় অপর পক্ষের জমির উদ্দিন নামের একজন আহত হলে তাঁকে উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।
এ ঘটনার পর জামালের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু আজ নিহতের স্ত্রী-সন্তানরা স্বজন হারিয়ে চরম ভয়, আতঙ্ক আর মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিহত জামাল উদ্দিনের স্ত্রী হালিমা বেগম অশ্রুভেজা চোখে আমার সিলেটের এই প্রতিবেদককে বলেন, “আমাদের চোখের সামনে মানুষগুলোকে নৃশংসভাবে খুন করা হলো। অথচ খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমাদের ঘরছাড়া করে রেখেছে। আজ জীবন বাঁচাতে আমরাই ফেরারি!”
ভয় ও আতঙ্কের কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “নিহত জামাল উদ্দিন অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। জীবনের অর্ধেক সময় প্রবাসে কাটিয়ে শেষ বয়সে দেশে এসেছিলেন পরিবারের সঙ্গে থাকতে। কিন্তু তাকেও সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হতে হলো। এই পরিবারের ক্ষতি আর কখনো পূরণ হওয়ার নয়।”
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিওসি কেছরীগুল এলাকায় সংঘটিত এই জোড়া খুনের ঘটনায় বড়লেখা থানায় মোট ১৬ জনকে সুনির্দিষ্ট আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আসামিদের মধ্যে ১৩ জনই স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী এবং বাকি তিন জন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দেশে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন শেষ হলেও চাঞ্চল্যকর এই জোড়া খুনের মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে বড়লেখা থানা ও স্থানীয় সিভিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো জবাবদিহিতা বা কার্যকর পদক্ষেপ নেই। মামলার পর দীর্ঘ পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও প্রধান আসামিসহ ১৪ জনের একজনকেও ধরতে না পারা পুলিশের চরম অবহেলা ও উদাসীনতাকেই নির্দেশ করে। প্রশাসনের এমন রহস্যজনক নীরবতা এবং আসামিদের ক্ষমতার দাপটের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও চরম শঙ্কিত।
মামলার দীর্ঘ স্থবিরতা ও আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান চিরাচরিত সুরে আমার সিলেটকে জানান, “নিহত দু’জন আপন ভাই ছিলেন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁদের মাথায় আঘাত করা হয়েছিল এবং আমরা তাঁদের ঘটনাস্থলেই মৃত অবস্থায় পাই। ঘটনার পর থেকেই পুলিশ প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
তবে দীর্ঘ পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও কেন প্রধান আসামিসহ বাকিদের আইনের আওতা আনা সম্ভব হলো না, কিংবা আসামিরা এলাকায় থাকা সত্ত্বেও কেন পুলিশ তাদের দেখছে না—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি। ওসির এই দাবি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত লক্ষ করা গেছে।
নিজেদের ঘরবাড়ি ও স্বজনদের হারিয়ে আজ ধুঁকে ধুঁকে মরছে অসহায় দুই পরিবার। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো বিশেষ দলের কোটা ব্যবহার করে খুনিরা যেন পার পেয়ে যেতে না পারে। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অবহেলার এই বিষাক্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে অবিলম্বে এজাহারভুক্ত বাকি আসামিদের দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার করতে হবে।
ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটিকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটিতে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং বর্বরোচিত এই জোড়া খুনের মামলা দ্রুততম ট্রায়ালের (বিচারিক প্রক্রিয়া) মাধ্যমে সর্বোচ্চ আইনি শাস্তি নিশ্চিতে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বড়লেখার নাগরিক সমাজ।