বাংলার রূপ যেন কখনও ফুরোয় না কোথাও তা নীরব, কোথাও আবেগময়, আবার কোথাও মুগ্ধতার আবেশে ভরপুর। মিহি বাতাসের ছোঁয়া, পাখির ডাক কিংবা সবুজের গভীরতায় হঠাৎই মনে ভেসে ওঠে “এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী।” যেন প্রকৃতি নিজেই গুনগুন করে শোনাচ্ছে সেই সুর। অথচ আফসোস থেকেই যায় জীবন কেটে যায়, তবুও বাংলার সব সৌন্দর্য আর দেখা হয়ে ওঠে না।

প্রকৃতি আমাদের যে অগণিত রূপ উপহার দিয়েছে, তার অনেকটাই এখনো অচেনা, অদেখা। সেই অজানার ভাঁজেই লুকিয়ে আছে এক অপার মুগ্ধতার ঠিকানা ‘বেকি লেক’। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের পাথারিয়া চা বাগানে অবস্থিত এই লেকটি যেন প্রকৃতির এক নিভৃত ক্যানভাস।

চারদিকে বিস্তীর্ণ চা বাগান, পাখির কুজন, বানরের খেলা আর লেকজুড়ে ভেসে থাকা শাপলা ফুল সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অপার্থিব দৃশ্যপট। প্রায় ২৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই লেকের সৌন্দর্য যে কাউকে মুহূর্তেই বিমোহিত করবে। সাদা ও লাল শাপলার সমারোহ এ লেকের প্রধান আকর্ষণ।

শীত মৌসুমে এখানে দেখা মেলে নানা প্রজাতির অতিথি পাখির। পাশাপাশি বক, হাঁসপাখি ও সারসের মতো পাখির আনাগোনা বছরজুড়েই থাকে, যা পাখিপ্রেমীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। আশপাশে চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার চিত্রও পর্যটকদের জন্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
তবে এমন অপার সৌন্দর্যের এই স্থানটি এখনো অনেকটাই অজানা। স্থানীয় চা শ্রমিকদের মতে, এই লেক অনেক পুরনো। আগে শুধু আমরাই আসতাম, এখন বাইরে থেকেও কিছু লোক আসে। সরকার বা প্রশাসনের উদ্যোগ নিলে এটি বড় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

স্থানীয় যুবক কাইয়ুম আহমদ বলেন, প্রচারের অভাবে অনেক সুন্দর জায়গা অজানাই থেকে যাচ্ছে। বেকি লেককে ঘিরে উন্নয়ন হলে বড়লেখার পরিচিতি বাড়বে।
পাথারিয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল নোমান জানান, বেকি লেককে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে তা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তিনি আরও জানান, সম্প্রতি চা বোর্ডের কর্মকর্তারা লেকটি পরিদর্শন করে উন্নয়ন বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন।

বেকি লেককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে একটি পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকা। এখানে নির্মাণ করা যেতে পারে দর্শন টাওয়ার, চালু করা যেতে পারে নৌকা ভ্রমণ, গড়ে উঠতে পারে হস্তশিল্পের দোকান, খাদ্যকেন্দ্র ও বিশ্রামাগার। এতে স্থানীয় জনগণের আয় বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে বড়লেখা যাওয়া যায়। ভাড়া ৭৫০–৮৫০ টাকা। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে কুলাউড়া নেমে সেখান থেকে সিএনজি বা গাড়িতে দক্ষিণভাগ বাজার হয়ে পাথারিয়া চা বাগানে পৌঁছানো যায়। সিলেট থেকেও ট্রেন বা সড়কপথে সহজেই যাওয়া সম্ভব।
বড়লেখায় ভালো মানের আবাসন এখনো সীমিত। তবে খাওয়ার জন্য কিছু ভালো রেস্টুরেন্ট রয়েছে। থাকার জন্য কুলাউড়ায় বাসা ভাড়া পাওয়া যায়, ভাড়া ৩০০–৮০০ টাকা। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য নিয়ে নিভৃতে লুকিয়ে থাকা বেকি লেক এখনো অপেক্ষায় আপনার আগমনের।

By আফজাল হোসেন রুমেল

বড়লেখা প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *