
ফুটবল কখনো কখনো অদ্ভুত লাগে। কাকতালীয়ভাবে কতকিছু মিলে যায়। গোলে, রেকর্ডে, ইতিহাসে এক শতাব্দী এসে জোড়া লাগে আরেক শতাব্দীতে! ১৯৮৬ সালের ২২ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন! ৪০ বছরের ব্যবধান দুই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে মিলিয়ে দিলো একই বিন্দুতে। দিয়েগো ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসি। ৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা আর আর্জেন্টিনার কীর্তিগাঁথা সবারই জানা। শিরোপা জয়ের পথে ৮৬ সালের ২২ জুন কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা করলেন দুই গোল। যার প্রথমটি হ্যান্ড অব গড নামে পরিচিত। পরেরটির পরিচিতি গোল অব দ্য সেঞ্চুরি নামে। ইংল্যান্ডের পাঁচ খেলোয়াড়কে বোকা বানিয়ে করা সেই গোলই গোল অব দ্য সেঞ্চুরির খ্যাতি পেয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ২২ জুন গ্রুপ পর্বে নিজেদের দ্বিতীয় খেলায় অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে পাওয়া ৩-০ গোলের জয়ে তিনটি গোলই লিওনেল মেসির! ২২ জুন অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসি যেন নামলেন ৮৬’র ম্যারাডোনাকে ফিরিয়ে আনতে! এদিন এক গোলই ছিল তাঁর জন্য যথেষ্ট। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে জার্মান স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসার(১৬ গোল) পাশে বসেন আলজেরিয়া ম্যাচে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তাই এক গোল করলেই মহা গৌরবের সেই রেকর্ড হয়ে যায় মেসির। কিন্তু ৪০ বছর আগের ম্যারাডোনাকে ফিরিয়ে আনতেই যেন বর্তমান বিশ্বের সেরা ফুটবলার করলেন দুই গোল! প্রথম ম্যাচের মতো কাল রাতের ম্যাচেও মেসির কল্যাণেই জয় আর্জেন্টিনার। টানা দুই ম্যাচে দলকে জেতালেন, দলের পাঁচ গোলের পাঁচটিই তাঁর, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের একক মালিকানা! ৩৯তম জন্মদিনের একদিন আগে এতসব কীর্তি। প্রশ্ন উঠতেই পারে লিওনেল মেসি কি তাহলে পেলে, ম্যারাডোনাকেও ছাড়িয়ে গেলেন!
ম্যাচের নবম মিনিটে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। অস্ট্রিয়ার ডি বক্সে ঢুকে লাউতারো মার্টিনেজ যখন শট নিতে যাবেন তখন তাঁকে ফেলে দেন দুই ডিফেন্ডার। রেফারী প্রথমে পেনাল্টি না দিলেও রিভিউয়ে পেনাল্টির বাঁশি বাজান তিনি। লিওনেল মেসিই স্পট কিক নিতে গেলেন এবং মিস করলেন। পেনাল্টি মিস করাটাই যেন আশির্বাদ হয়ে এলো মেসি আর তাঁর দলের জন্য! একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেন স্কালোনির শিষ্যরা। কিন্তু অস্ট্রিয়ার ডি বক্সে ঢুকে সেইসব সুযোগ নষ্ট হয় বারবার। লাউতারো মার্টিনেজকে খুজেই পাওয়া যাচ্ছিল না মাঠে। তবু স্কালোনি তাঁর ওপরই বিশ্বাস রেখেছিলেন। টানা দুই ম্যাচে কোচের আস্থার প্রতিদান দিতে ব্যর্থ ইন্টার মিলান তারকা। মার্টিনেজ, দি পল, ম্যাক এ্যালিস্টাররা যখন সুযোগ মিস করছেন, পেনাল্টিতে ব্যর্থ মেসিই তখন আশির্বাদ হয়ে আসেন। ৩৮ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে অস্ট্রিয়ার বক্সে আসা মাইনাস থিয়াগো আলমাদা ধরতে পারতেন, কিন্তু হঠাৎ বুদ্ধিতে ছেড়ে দিলে বল পেয়ে যান মেসি। ডান পা দিয়ে থামিয়ে জাদুকরী বাঁ পায়ের চেনা বাঁকানো শটে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন মেসি। দলকে এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি এই গোলেই ক্লোসাকে ছাড়িয়ে উঠলেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে। দ্বিতীয়ার্ধে নিস্প্রব লাউতারো মার্টিনেজকে উঠিয়ে আলভারেজকে মাঠে নামান স্কালোনি। কিন্তু আলভারেজও যেন তাঁর ছায়া হয়ে আছেন দুই ম্যাচে। আর্জেন্টিনার গোল মিসের মহড়ায় পাল্টা আক্রমণে গতি বাড়ায় অস্ট্রিয়া। অভিজ্ঞ ওটামেন্দি আর লিসান্দ্রো মার্টিনেজের দক্ষতায় অবশ্য খেলায় ফিরে আসতে পারেনি ডেভিড আলাবার দল। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে অতিরিক্ত পাঁচ মিনিটের সাইন উপরে তুলেন চতুর্থ রেফারী। এই সময়ে কাউন্টার এ্যাটাকে দ্রুত অস্ট্রিয়া সীমানায় ঢুকেন আলভারেজ। ডান প্রান্ত থেকে তাঁকে উদ্দেশ্য করেই বল বাড়ান মেসি। বক্সে ঢুকে আলভারেজের নেয়া শট গোলরক্ষক ফিরিয়ে দিলে মেসি শট নেন গোলমুখে। সেটিও ফিরিয়ে দিলে আবারও বল আসে আর্জেন্টাইন জাদুকরের পায়ে। এবার একেবারে নিখুঁত ফিনিশিং, মেসি ২- অস্ট্রিয়া ০!
৬ পয়েন্ট নিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করলো আর্জেন্টিনা। দুই ম্যাচে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের গোল ৫টি। পাঁচটি গোলই করেছেন ৩৯ বছরের লিওনেল মেসি। আসলে খেলতে যে জানে, ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে জানে যে, তাঁর কাছে বয়স কেবলই একটা সংখ্যা।