বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়—একটি জাতির সংকট, সংগ্রাম ও আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। বঙ্গবীর জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী তাঁদেরই একজন। তিনি ছিলেন একজন সৈনিক, সামরিক সংগঠক, রাজনীতিক, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। তাঁর জীবনজুড়ে ছিল কর্তব্যনিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, সততা, সময়ানুবর্তিতা, আত্মমর্যাদা এবং নীতির প্রতি অবিচল আনুগত্য। জেনারেল ওসমানীর জন্ম ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন আসাম প্রদেশের সুনামগঞ্জ মহকুমা শহরে। তাঁর পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান তখন সুনামগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল সিলেট জেলার বালাগঞ্জের তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল সিলেট জেলার বালাগঞ্জের দয়ামীর গ্রামে, যা বর্তমানে ওসমানীনগর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। ফলে তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে সুনামগঞ্জের জন্মভূমি এবং সিলেটের পৈতৃক ঐতিহ্য—দুই-ই গভীরভাবে যুক্ত। শৈশব থেকেই ওসমানী ছিলেন মেধাবী, আত্মনির্ভর ও শৃঙ্খলাপরায়ণ। তিনি সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ইংরেজিতে অসাধারণ দক্ষতার জন্য তিনি ‘প্রিটোরিয়া পুরস্কার’ লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ১৯৩৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ভূগোল বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পরবর্তীতে এমএ পর্যায়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। এই অবস্থায় ১৯৩৯ সালে তিনি ভারতীয় সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৪০ সালের ৫ অক্টোবর ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মিতে কমিশন লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তাঁর সামরিক জীবন শুরু হয়। তিনি বার্মা ফ্রন্টে দায়িত্ব পালন করেন এবং অল্প বয়সেই অসাধারণ সামরিক দক্ষতার পরিচয় দেন। ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। বিভিন্ন সামরিক ইতিহাসভিত্তিক বিবরণে তাঁকে সে সময়ের ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মির সর্বকনিষ্ঠ মেজর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মাত্র ২৩ বছর বয়সে একজন বাঙালি যুবকের এত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব লাভ ছিল অসাধারণ ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একজন দক্ষ অফিসারই বানায়নি, বরং যুদ্ধ পরিচালনা, রসদ ব্যবস্থাপনা, সৈন্য পরিচালনা, সংকট মোকাবিলা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসাধারণ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হলে তিনি নবগঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং পরবর্তিতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে তিনি কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং ১৯৬৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ওসমানী খুব দ্রুত উপলব্ধি করেন যে রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী বাঙালিরা সামরিক কাঠামোতেও বৈষম্যের শিকার। তাঁর কাছে সেনাবাহিনী শুধু চাকরি ছিল না; এটি ছিল একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। তাই সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং মর্যাদার প্রশ্নে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তিনি বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে ভূমিকা রাখেন। পূর্ব বাংলার মানুষের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রচলিত অবজ্ঞা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়। এই অবস্থানের কারণে তাঁর সামরিক ক্যারিয়ারও সবসময় মসৃণ ছিল না। অবসরের পর ১৯৭০ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন—এটি শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধকে সফল করতে প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি একটি সুসংগঠিত সামরিক কাঠামো। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানীকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান ও সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তগুলোর একটি। একদিকে ছিল পাকিস্তানের সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী; অন্যদিকে সদ্য সংগঠিত বাঙালি সামরিক সদস্য, ইপিআর, পুলিশ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিবাহিনী। এই পরিস্থিতিতে ওসমানীর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। তিনি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সেক্টর নির্ধারণ করেন এবং সেক্টর কমান্ডারদের দায়িত্ব বণ্টন করেন। সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি তিনি মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্যকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ একটি সুসংগঠিত সামরিক রূপ লাভ করে। নিয়মিত বাহিনী, গেরিলা বাহিনী ও বিভিন্ন প্রতিরোধশক্তিকে সমন্বিত করার কাজে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ও যুদ্ধের পরিণতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হলে ২৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তাঁকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। স্বাধীনতার পর ওসমানীর সামনে আরেকটি বড় দায়িত্ব ছিল—যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্রের সামরিক কাঠামো গড়ে তোলা। মুক্তিযুদ্ধের সময় গড়ে ওঠা বিভিন্ন বাহিনী ও যোদ্ধাদের একটি জাতীয় সশস্ত্র বাহিনীর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে জেনারেল পদ বিলুপ্ত হলে তিনি সামরিক জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ, যোগাযোগ, নৌপরিবহন, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও বিমান-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সরকারের নীতি, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। ১৯৭৪ সালের মে মাসে ওসমানী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন (তারপত্রে সংসদ সদস্যের পদ থেকেও পদত্যাগের কথা লেখা ছিল, খুব সম্ভবত শুধু মন্ত্রত্ব থেকে পদত্যাগ গৃহিত হয়েছিল, কেননা পরবর্তীতেও তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন।) তাঁর এই পদত্যাগকে শুধু ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি গভীরভাবে আস্থাশীল ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর নিজের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বোঝা যায়, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছিল। ১৯৭৪ সালের ১ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে লেখা তাঁর চিঠিতেও তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র ও জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তাঁর উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর উদ্বেগগুলোর কেন্দ্রবিন্দু ছিল— সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও কায়েমি স্বার্থ, প্রশাসনিক অদক্ষতা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার অভাব, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের যথাযথ মূল্যায়নের প্রয়োজন, দলীয় প্রভাব এবং সর্বোপরি সংসদীয় গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার। (মূলচিঠি জাতীয় আর্কাইভে রক্ষিত আছে।) এরপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করা হয়। এর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি-শাসিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রপতির হাতে ব্যাপক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। এর পরপরই বাংলাদেশে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ রাষ্ট্রপতির আদেশে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল—গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৬ জুন বাকশালের সাংগঠনিক কাঠামো ও কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আওয়ামী লীগসহ দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি জাতীয় দলের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংসদ সদস্যদেরও বাকশালে যোগদানের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই পরিবর্তনকে অনেকে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় একটি নতুন ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছিলেন; আবার সমালোচকদের কাছে এটি ছিল বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের সূচনা। ইতিহাসে বাকশাল নিয়ে এই বিতর্ক আজও বিদ্যমান। এই পরিবর্তনের সঙ্গে জেনারেল ওসমানীর রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয়। তিনি একদলীয় ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। বাকশালে যোগদানের পরিবর্তে তিনি সংসদ সদস্যপদ ত্যাগ করেন এবং আওয়ামী লীগের সদস্যপদও পরিত্যাগ করেন। তাঁর সঙ্গে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনও সংসদ সদস্যপদ ত্যাগ করেছিলেন। ওসমানীর এই সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে যে স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও সেই মূল্যবোধের প্রতি তাঁর আনুগত্য বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতার জন্য রাজনীতিতে আসেননি—দেশের প্রয়োজনে রাজনীতিতে এসেছিলেন। ফলে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও বিবেকের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো ব্যবস্থাকে মেনে নিতে পারেন নি। বাকশাল গঠনের প্রাক্কালে ওসমানীর অবস্থান ছিল গণতন্ত্র, সাংবিধানিকতা ও জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের প্রকাশ। ক্ষমতার সঙ্গে আপস না করে তিনি নিজের বিশ্বাস ও বিবেকের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ২২ জানুয়ারি ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুকে লেখা চিঠিতে তিনি জানান, ২১ জানুয়ারির আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাবের পক্ষে তিনি ভোট দেননি। কারণ, তাঁর মতে, এতে তাঁর বিশ্বাস ও বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করা হতো এবং ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যে শাসনতন্ত্র অনুমোদন করেছিল, তার সঙ্গে প্রতারণা করা হতো। তাই প্রস্তাবটি সংসদে উঠলে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে তিনি একযোগে সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে চিঠির শেষে তিনি বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের সাফল্য কামনা করে দেশ ও জনগণের স্বার্থে তাঁর আজীবন নিঃস্বার্থ সেবার কথা উল্লেখ করেন। মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর কাছে চাকরির জন্য বহু মানুষ আসতেন। প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মন্ত্রীর কাছে চাকরির সুপারিশ চাওয়া ছিল অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ওসমানী ছিলেন অন্য ধাতের মানুষ। কথিত আছে, কেউ চাকরির অনুরোধ নিয়ে তাঁর কাছে এলে তিনি তাঁকে বসিয়ে আপ্যায়ন করতেন, বাড়ি ফেরার জন্য ভাড়ার টাকাও দিতেন; কিন্তু পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতেন—তিনি চাকরির জন্য সুপারিশ করতে পারবেন না। অর্থাৎ মানুষকে তিনি অসম্মান করতেন না, কিন্তু নিজের নীতির সঙ্গে আপসও করতেন না। মানবিকতা ও নীতিনিষ্ঠার এই সমন্বয় তাঁর চরিত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ওসমানীর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা। তিনি পদ, ক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য নিজের নীতির সঙ্গে আপস করতে চাননি। ১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমদ তাঁকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। কিন্তু ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এই ধারাবাহিক পদত্যাগগুলোকে তাঁর নীতিনিষ্ঠ চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়। তিনি মনে করতেন, পদ মানুষের মর্যাদা তৈরি করে না; মানুষের নীতি, চরিত্র ও কাজই তাকে মর্যাদা দেয়।
ওসমানীর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জেনারেল ও মন্ত্রী—এতগুলো পরিচয় থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিলাসিতা পছন্দ করতেন না। তাঁর জীবনযাত্রায় সামরিক শৃঙ্খলা ও সংযমের ছাপ ছিল স্পষ্ট। সিলেটের ওসমানী জাদুঘরে সংরক্ষিত তাঁর ব্যবহৃত পোশাক-পরিচ্ছদ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী দেখলেও তাঁর সরল জীবনযাপনের একটি ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর সাদাসিধে জীবন নিয়ে একটি ঘটনা অনেকের মুখে শোনা যায়। তাঁর মন্ত্রিত্বকালের এক এপিএসের কাছ থেকে শোনা যায়, একদিন তিনি একটি গেঞ্জির ওপর পাঞ্জাবি পরেছিলেন। গেঞ্জিটি ছিল ছেঁড়া। এপিএস তাঁকে গেঞ্জিটি পরিবর্তন করার অনুরোধ করলে তিনি নাকি সহজভাবে বলেছিলেন, ‘উপরে তো কোট দেব, ছেঁড়া দেখা যাবে না।’ ঘটনাটি সত্যিকার অর্থে তাঁর জীবনের কতটা প্রতিনিধিত্ব করে তা যাচাই করা কঠিন; তবে তাঁর পরিচিত সরল জীবনযাপন ও অল্পে সন্তুষ্ট থাকার প্রবণতার সঙ্গে এই গল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী দেখলে বোঝা যায়, জাঁকজমক তাঁর জীবনের অংশ ছিল না। সময়ানুবর্তিতার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনন্য। সিলেটের মানুষের মুখে আজও একটি ঘটনা শোনা যায়। কথিত আছে, নির্বাচনী প্রচারের সময় বালাগঞ্জে একটি জনসভা বিকেল ৩টায় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সভা বলে কেউ কেউ ভেবেছিলেন, আসরের নামাজের পর সভা শুরু হবে। ফলে নির্ধারিত সময় ৩টায় মাঠ প্রায় ফাঁকা। ওসমানী কিন্তু ঠিক সময়েই সভাস্থলে উপস্থিত হলেন। জনগণ বলতে প্রায় কেউই নেই। যারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্যেই তিনি বক্তৃতা দিলেন এবং সময়মতো চলে গেলেন। গল্পটির তাৎপর্য গভীর—মানুষ আসবে কি আসবে না, সভা জমবে কি জমবে না, তা তাঁর কাছে সময়ের মূল্যকে পরিবর্তন করেনি। নির্ধারিত সময় মানেই নির্ধারিত সময়। তাঁর সময়ানুবর্তিতা শুধু সভা-সমাবেশে সীমাবদ্ধ ছিল না। সামরিক জীবনে সময়ের গুরুত্ব তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর কাছে দায়িত্ব পালনে দেরি করা ছিল শুধু ব্যক্তিগত ত্রুটি নয়—এটি ছিল কর্তব্যের প্রতি অবহেলা। আজকের সমাজে যখন সময়ের প্রতি অবহেলা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, তখন ওসমানীর জীবন থেকে এই শিক্ষাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ওসমানীর চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল আত্মমর্যাদা। তিনি অন্যায়কে অন্যায় বলতে দ্বিধা করতেন না। নিজের রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও মতবিরোধ হলে তিনি পদত্যাগ করেছেন। ক্ষমতার সঙ্গে আপস করে নিজের অবস্থানকে নিরাপদ করার চেষ্টা করেননি। এই কারণেই তাঁর জীবনে কখনো কখনো তাঁকে ‘কঠোর’ বা ‘দুর্বিনীত’ বলে মনে করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর কঠোরতার ভিতরে ছিল দায়িত্ববোধ ও নীতির প্রতি আনুগত্য। তাঁর ন্যায়বোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং ন্যায়ের প্রতি গভীর অঙ্গীকার তাঁর ব্যক্তিত্বকে অনন্য করে তুলেছিল। সিলেটে একটি মজার কথাও প্রচলিত আছে—কাউকে খুব সাদাসিধে, নিয়মকানুন মেনে চলা কিংবা অবিবাহিত অবস্থায় দেখলে কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন, ‘উনি বোধহয় ওসমানী হতে যাচ্ছেন!’ এই রসিকতার পেছনেও আসলে একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জীবনাচরণের ছাপ রয়েছে। ওসমানী ছিলেন আজীবন চিরকুমার। তাঁর ব্যক্তিজীবনে সংসার ও পারিবারিক বন্ধনের পরিবর্তে দেশ, কর্তব্য ও জনজীবনই যেন বড় হয়ে উঠেছিল। অনেকের লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায় যে ওসমানী একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি লিখতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সেই ডায়েরিটি আর পাওয়া যায়নি বলে জানা যায়। ডায়েরিটি যদি কখনো উদ্ধার করা যেত, তাহলে তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তা, রাজনৈতিক মূল্যায়ন, মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং সমকালীন ঘটনাবলি সম্পর্কে আরও প্রত্যক্ষ ধারণা পাওয়া সম্ভব হতো। ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায় হয়তো সেই ব্যক্তিগত নথিতে সংরক্ষিত ছিল। তাই তাঁর ডায়েরির অনুপস্থিতি বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার একটি অপূর্ণতা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ ছিল অস্তিত্বের সংকটের বছর। সেই সংকটে ওসমানী ছিলেন সামরিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি যুদ্ধের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামরিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল শুধু যুদ্ধ করা নয়—যুদ্ধকে সংগঠিত করা, নেতৃত্ব দেওয়া এবং বিজয়ের দিকে পরিচালিত করা। স্বাধীনতার পর দেশ ছিল ধ্বংসস্তূপে পরিণত। যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত, অর্থনীতি দুর্বল, প্রশাসন পুনর্গঠনের প্রয়োজন, আর সামরিক কাঠামো ছিল সদ্য গঠিত। এমন পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তিনি ক্ষমতার মূলধারা থেকে দূরে সরে যান। ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি জাতীয় জনতা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর সভাপতি হন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হন। জীবনের শেষ পর্যায়েও ওসমানীর দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসেনি। ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.)-এর দরগাহ প্রাঙ্গণের কাছে তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ওসমানী জাদুঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁর নাম বহন করছে। জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীর জীবনকে শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তার জীবনী হিসেবে দেখলে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে না। তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা নয়, দায়িত্বই মানুষের প্রকৃত পরিচয়; পদ নয়, চরিত্রই মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে। তিনি দেখিয়েছেন, একজন সৈনিক একই সঙ্গে দেশপ্রেমিক নাগরিক ও নীতিবান রাজনীতিক হতে পারেন। তিনি আরও দেখিয়েছেন, সংকটের সময়ে নেতৃত্ব মানে শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়; নিজের জীবন, মর্যাদা ও স্বার্থকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কাছে সমর্পণ করা।
আজকের বাংলাদেশে সততা, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নীতির প্রশ্নে আপসহীনতার যে প্রয়োজন, জেনারেল ওসমানীর জীবন সেই মূল্যবোধগুলোর একটি শক্তিশালী উদাহরণ। তাঁর জীবন আমাদের আরও শেখায়—মানুষকে সম্মান করা যায়, কিন্তু অন্যায় সুপারিশ করা যায় না; দরিদ্র বা সাধারণ জীবনযাপন করা যায়, কিন্তু দায়িত্বে সাধারণ হওয়া যায় না; রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু নীতির প্রশ্নে আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বহু বীরের নাম উচ্চারিত হয়। তাঁদের মধ্যে বঙ্গবীর জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীর স্থান অনন্য। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বের প্রতীক, আত্মমর্যাদার প্রতীক এবং নীতিনিষ্ঠ দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশের ক্রান্তিকালে একজন দৃঢ়চেতা, সৎ ও দক্ষ মানুষের নেতৃত্ব একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে কত গভীর ভূমিকা রাখতে পারে। জেনারেল ওসমানী শুধু অতীতের একজন সেনানায়ক নন; তিনি বাংলাদেশের জাতীয় চেতনা, সামরিক ঐতিহ্য এবং নৈতিক নেতৃত্বের এক স্থায়ী প্রতীক। তাঁর জীবনের দিকে ফিরে তাকালে তাই শুধু ইতিহাসকে স্মরণ করা হয় না—নিজেদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন জাগে। আমরা যদি তাঁর মতো সময়কে মূল্য দিই, দায়িত্বকে ক্ষমতার ঊর্ধ্বে স্থান দিই, ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে নীতি ও আদর্শকে অগ্রাধিকার দিই এবং মানুষের প্রতি মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করি—তাহলেই হবে জেনারেল ওসমানীর প্রতি সত্যিকারের সম্মান প্রদর্শন। তাঁর জীবন ও আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি সততা, কর্তব্যবোধ, শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করতে পারি, তবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা আমাদের জাতীয় জীবনে বাস্তব রূপ লাভ করবে। আর সেই পথ ধরেই বাংলাদেশ আরও ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
লেখক: সাবেক প্রিন্সিপাল, মদন মোহন কলেজ, সিলেট।



